উপ-সম্পাদকীয়

হাওর পানিতে ভাসছে, বোরো ফসলের সর্বনাশ

এ.কে.এম শামছুল হক রেনু : হাওর অঞ্চলে এমনিতেই টান এলাকার মতো যেমনি সারা বছর কোন রবিশস্যের আবাদ হয়না, তেমনি অন্যান্য এলাকার মতো আউশ, আমন ও ইরি ধানের চাষ হয় না। বছরে তাদের একটি মাত্র ফসল উৎপাদন হয়। তা হচ্ছে বোরো ধান। এই বোরো ধানই হাওর এলাকার কৃষককের একমাত্র সারা বছর খেয়ে জীবন ধারণের একমাত্র সম্বল। এই ধান বিক্রী করেই ছেলে মেয়েদের পড়ালেখাসহ বৈষয়িক অন্যান্য কাজ করা হয়ে থাকে। অপরদিকে স্বল্প আয়ের মানুষ ও কৃষকরা বিত্তশালীদের কাছ থেকে আগাম টাকা দিয়ে জমি বর্গা নিয়েও বোরো ধানের চাষ করে থাকে। কিন্তু এবারের আগাম বন্যা, উজানের পানি, পাহাড়ী ঢল এবং জোয়ারের পানিতে হাওর সয়লাব হয়ে যাওয়ার পর কৃষক সারা বছরের জন্য সঞ্চিত ধান ঘরে তুলতে পারেনি।

          যারা জমির মালিক বা জোতদার তাদের যেমনি দুঃখ, তেমনি যারা দাদন ও এনজিওর টাকা দিয়ে জোতদারের জমি বর্গা নিয়ে বোরো ফসল ঘরে তুলতে পারেনি তাদেরও সীমাহীন দুঃখ বেদনার আর শেষ থাকেনি। একদিকে বোরো ফসলের দিকে চেয়ে থেকে যেমনি সবকিছুর সর্বনাশ, তেমনি রাত পোহাতেই বিভিন্ন মহাজন ও বিভিন্ন এনজিওর টাকা পরিশোধের তাগিদ থেকে বাঁচার জন্য পরিবার পরিজন নিয়ে অনেকেরই নিরুদ্দেশ হওয়ার কথাও বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এবারের আগাম বন্যা, উজানের পানি, পাহাড়ী ঢল ও জোয়ারের পানিতে দেশের প্রায় এলাকার বোরো ফসল তোলার আগেই ক্ষেতের ফসল ক্ষেতেই পানিতে ডুবে ও পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে। এমনিভাবে সুনামগঞ্জের হাকালুকি হাওর, বড় হাওর, শনির হাওর, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলার হাওরের মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ, কষ্ট ও বেদনার যেন অন্ত নেই। এমনিভাবে নতুন করে প্রতিদিন একেক করে নতুন হাওর প্লাবিত হচ্ছে ও হাওরের বোরো ধান পানিতে ডুবে গেছে। এ ব্যাপারে অনেক ঘটনা নজরে আসলেও একটি ঘটনার উল্লেখ করা হলো। প্রতি বছর বংশানুক্রমে আমাদের এলাকার বেশ কয়টি সাধারণ কৃষক পরিবার জোতদারের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা দিয়ে জমি বর্গা নিয়ে ভাটি এলাকায় পৌষ মাস শুরু হতে না হতেই হালের গরু, মহিষ, টায় টুবলা ও কামলা মুনি এবং ছেলে পেলে নিয়ে বোরো ধানের আবাদ করার জন্য হাওর এলাকায় চলে যায়। যাকে

আঞ্চলিক ভাষায় “জিরাতি” বলা হয়ে থাকে। আবার ৩/৪ মাস হাওরে থেকে বৈশাখ মাসে নতুন ধান নিয়ে ঘরে ফিরে আসে। এই ধান বিক্রী করে যেমনি দাদন, এনজিও এবং মহাজনের টাকা পরিশোধ করে তাকে তেমনিভাবে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ মেটানো সহ সারা বছরের খাদ্য মওজুত করে রাখা হয়ে থাকে। তাদের অবস্থা নাজুক হলেও এমনিভাবে কায় ক্লেশে সারা বছর কারো দ্বারস্থ না হয়ে সংসার চালিয়ে থাকে।

             এ বছর হাওরের ধান আনতে না পারায় শূণ্য হাতে ঘরে ফিরতে হয়। তারপর অভাবী সংসারে দাদন ও এনজিওর টাকার চাপ মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের রূপ ধারণ করেছে। এ ধরণের অজস্র ঘটনার শেষ নেই। কৃষকের দাদন, মহাজনের টাকা ও এনজিওর টাকা পরিশোধের ব্যাপারে তাদের ভিটামাটি বিক্রী করা ছাড়া কোন উপায়ন্তর নেই। এ লেখার সময় নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, কালিয়াজুরি, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার কথা জানা যায়। তন্মধ্যে এ পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল এলাকার হাওরে ৫৫ হাজার ৭৭৭ হেক্টর বোরো ধানের আধা-পাকা জমি পানির নিচে তলিয়ে পঁচে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে ধান ও ধান গাছের পচনের ফলে পানিতে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে হাইড্রোজেন সালফাইড ও অ্যামোনিয়া গ্যাসের মাত্রা অন্যদিকে কমে গেছে অক্সিজেনের মাত্রা। যার ফলে এ সমস্ত হাওরে মাছের মড়ক যেভাবে বাড়ছে টিক তেমনিভাবে হাওরের পঁচা ও বিষাক্ত মাছ খেয়ে খামারীদের হাঁসও মরতে শুরু করেছে। জানা যায়, ভাটি এলাকায় হাওরে এ পর্যন্ত ১০ হাজার হাঁস মরেছে। যার সঠিক পরিসংখ্যান এখনও জানা যায়নি। এমনিভাবে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন হাওরে পানি বৃদ্ধির সংবাদ জানা যাচ্ছে এবং সেই সমস্ত এলাকার কৃষক থেকে শুরু করে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ চরম ও অবর্ণনীয় কষ্টে দিন যাপন করছে। সূত্রে জানা যায় ১৯/০৪/১৭ ইং বুধবার সুনামগঞ্জের হাওরের ক্ষতিগ্রস্থদের ব্যাপারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল তা জানতে গেলে এলাকার সর্বস্তরে মানুষ, চেয়ারম্যান, মেম্বার, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা হাওর এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করে জরুরী খাদ্য ও অন্যান্য ত্রাণ সামগ্রী বিতরনের কথা জানালে, ত্রান সচিব ১৯/০৪/১৭ বুধবার সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বলেছেন, দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নামে দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরনের একটি আইন রয়েছে। ২০১২ এর ২২ ধারায় বলা হয়েছে, কোন এলাকার অর্ধেকের ওপরে জনসংখ্যা মারা যাওয়ার পর ওই এলাকাকে দুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে হয়। তিনি নাকি আরো বলেছেন, কিসের দুর্গত এলাকা। একটি ছাগলও তো মারা যায়নি। যদিও এ পর্যন্ত এলাকার হাজার হাজার টন বোরো ধান পাকা ও আধা-পাকা অবস্থায় পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শত শত টন মাছ মড়কে ভেসে উঠছে, খামারী ও কৃষকদের শত শত হাঁস বিষাক্ত ও পঁচা মাছ খেয়ে মরে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জনৈক আইনজীবী, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ অনেকেই সচিবের দুর্গত এলাকার এ সংজ্ঞাকে অর্থাৎ ২০১২ এর ২২ ধারাকে উদ্ভট উপাখ্যান বলে মন্তব্য করেছেন।

            এরই মধ্যে সুনামগঞ্জের হাওরের দুর্দশা গ্রস্থ মানুষেকে নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের চরম অপমানকর, উপহাসমূলক ও উদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের প্রতিবাদে ও মন্ত্রণালয় থেকে তাকে দ্রুত প্রত্যাহারের দাবীতে “হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও” আন্দোলন ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে মানববন্ধন হয়েছে। ২১/০৪/১৭ ইং শুক্রবার সুনামগঞ্জ শহরের আদালত স্কয়ারে (ট্রাফিক পয়েণ্ট) অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে আইনজীবী, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, সংস্কৃতি কর্মি, শিক্ষক, কৃষক, সমাজ সেবক সহ অনেকেই অংশগ্রহন করে থাকেন। বক্তারা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২ এর ২২ ধারার উপধারায় দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে, অর্ধেকের বেশী মানুষ মারা যাওয়ার কোন শর্তের কথা উল্লেখ নেই বলে মন্তব্য করে থাকেন।

          বৃহষ্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ২০ ও ২১ এপ্রিল পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে ছোট বড় ৫২টি বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। তাতে কয়েক সহস্রাধিক হেক্টর ধানের জমি তলিয়ে যায়। তারপরও পানি বাড়ার সাথে সাথে আরো নতুন এলাকার ধানের জমি প্লাবিত হচ্ছে। উজানের বানের পানি ও পাহাড়ী ঢলের কারণে নেত্রকোণা জেলায় মোহনগঞ্জে সম্প্রতি ১১৪ কোটি টাকার বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে। উপজেলার ১৮ হাজার ৪০০ কৃষক

মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে এ লেখার দুদিন আগে সরকারীভাবে কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে ৪৮ টন চাউল, ১০ লাখ ৪০ হাজার টাকা বিতরণের কথা জানা যায়। তম্মধ্যে জনপ্রতি ১৫ কেজি করে চাউল এবং ২ হাজার কৃষকের মধ্যে জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে বিতরণের কথাও জানা যায়। এখনও ১৩ হাজার ২০০ কৃষক কোন সহায়তা পায়নি।

          এ পরিসংখ্যানটি ২০/০৪/১৭ ইং ও ২১/০৪/১৭ ইং শুক্রবারের হলেও তারপর থেকে অবিরাম বর্ষন, পাহাড়ী ঢল ও উজানের পানি আসার প্রেক্ষাপটে দেশের অন্যান্য হাওরে যেমন চরম নাজুক অবস্থা সৃষ্টি ও নতুন নতুন অবশিষ্ট হাওরে যেমনি পানি ঢুকছে, তেমনি নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের অবস্থা এখন চরম সংকটে নিপতিত।

            এমতাবস্থায় দেশের বিজ্ঞজন ও ভোক্তভোগীরা মনে করে দুর্গত এলাকার জন্য ২০১২ এর ২২ ধারা সহ যে কোন ধারা উপধারায় বিতর্কে না যেয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করে এ মুহুর্তে অসহায় ও চরম কষ্টে দিনযাপনরত হতভাগা কৃষকদের পাশে সরকার ও সমাজের বিত্তশালীদের একাত্মতা হয়ে কাজ করা অত্যাবশ্যক বলে মনে হয়। কথায় বলে “হিলে পাটায় ঘষাঘষি মরিচের জান শেষ” এখান থেকে উপলব্ধি করে ২০১২ এর ২২ ধারা ও তথ্য থেকে বেড়িয়ে এসে যত দ্রুত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায় ততই মঙ্গল ও বাস্তবসম্মত বলে অনেকেই মনে করে থাকে। আরো জানা যায়, যে সমস্ত স্বল্প আয়ের কৃষক মহাজনদের কাছ থেকে দাদন ও এনজিও থেকে টাকা নিয়ে বোরো ধানের আবাদ করেছিল, কৃষকদের এহেন দুরবস্থার সময়ও দাদন দেয়া মহাজন ও এনজিওদের চাপ থেকে রক্ষা করার আশু প্রয়োজন বলে ভোক্তভোগীসহ দেশের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ মনে থাকে। জানা যায়, এমনিতেই যাদের বাঁচার ঠাঁই নেই, অন্ন নেই, বস্ত্র নেই, ছেলে মেয়েদের বই কিনে দেয়ার অবস্থা নেই, এক বেলা খাওয়ার ব্যবস্থা নেই, তারপর দাদনের মহাজন ও এনজিওদের তাড়নায় বসতভিটায় ঠাঁই পাচ্ছে না। ২৩/০৪/১৭ ইং রোববারের বিভিন্ন গনমাধ্যমে দেখা যায়, এত দুরবস্থার সময় ও মহাজনের দাদন ও এনজিওর টাকার তাগেদার কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে একজন কৃষক মারা গেছে। হাওরের কৃষক ও জিরাতিদের অসহায়ত্বের কথা ভেবে ও বিবেচনা করে এনজিও এবং মহাজনদের দাদনের টাকা আপাতত সময় দিয়ে দুর্গত এলাকার কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো সরকার, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট ভোক্তভোগী ও দেশের মানুষের প্রত্যাশা।


মন্তব্য