উপ-সম্পাদকীয়

শ্রীলঙ্কা কি সহজে শৃঙ্খলমুক্ত হবে

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার পর বরাবরই এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের চেয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে একটি বিশিষ্ট মহিমায় উদ্ভাসিত। যদিও দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশটির উত্তর-পূর্বে সংখ্যালঘু তামিল বিদ্রোহীদের পৃথক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাস রয়েছে, যা উন্নয়নের পথে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। তথাপি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সাক্ষরতার দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ সত্তা ধরে রেখেছিল শ্রীলঙ্কা। ২০০৯ সালে তামিল বিদ্রোহের অবসান হলে নতুন উদ্যমে যখন তারা জাঁতি গঠনে মনোযোগী হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, আঞ্চলিক রাজনীতির বাস্তবতা বাদ সাধল এতে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতার বাইরেও এশীয় রাজনীতির একটি নিজস্ব ধারা রয়েছে, যেখানে চীন বর্তমানে তার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান দিয়ে বিশ্বকে চোখ রাঙাচ্ছে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে ভারতের একধরনের প্রচ্ছন্ন প্রভাব ছিল এবং বলা যায় তামিল বিদ্রোহ এবং এর ফলে শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা দূরীকরণে তাদের বারবার ভারতের মুখাপেক্ষী হতে হয়েছে। অবশ্য এর জন্য ভারতকেও মূল্য দিতে হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর মতো রাজনীতিবিদসহ আরো অনেককে তামিলদের হাতে প্রাণ হারানোয়। তামিল বিদ্রোহ অবসানে নেতৃত্বের দূরদর্শিতার কারণে কিংবা ঘটনাক্রমেই হোক দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে, যিনি ২০০৫-২০১৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবকাঠামোগত উন্নয়নকে সর্বাধিক জোর দেওয়া হয় এবং সবার আগে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসে চীন। চীনের সহায়তায় সেখানে হাম্বানতোতা সমুদ্রবন্দরসহ (মাহিন্দ রাজাপক্ষের নির্বাচনী এলাকা) অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক চীনা ঋণ গ্রহণ করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০১৫ সালের নির্বাচনে রাজাপক্ষে পরাজিত হন তাঁরই ক্যাবিনেটের একসময়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মাইথ্রিপালা সিরিসেনার কাছে। বলা যায়, সে সময় রাজাপক্ষেকে পরাজিত করতে সব বিরোধী জোট একাট্টা হয়ে লড়েছিল, নেপথ্যে ছিল ভারত। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে চীনের আধিপত্য রুখতে তথা চীনের বিনিয়োগের নামে নব্য ঔপনিবেশিক আকাক্সক্ষাকে দমনে ভারতের কৌশল বেশ ভালোই কাজ করছিল।
গত কিছুদিন ধরে জোট সরকারের মধ্যকার বিশেষত প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা ও প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয় একটি অভিযোগকে কেন্দ্র করে আর তা হচ্ছে ভারতের গুপ্তচর বাহিনীর সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী সিরিসেনা ও তাঁর একান্ত অনুগতজনদের হত্যার পরিকল্পনা হচ্ছে। বিষয়টি গুজব নাকি বাস্তব সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া না গেলেও চীনপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপক্ষের ভাগ্য খুলে যায় এর মধ্য দিয়ে। সিরিসেনা কোনো রকম ঝুঁকিতে গেলেন না। নিজের ও দেশের অর্থনৈতিক অনাগত ভবিষ্যতের চিন্তায় প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহকে বরখাস্ত করে তাঁর স্থলে নিয়োগ দিলেন রাজাপক্ষেকে। শ্রীলঙ্কার বিদ্যমান অর্থনৈতিক দৈন্যদশা, সরকারি আয়ের ৮০ শতাংশ বিদেশি দেনা পরিশোধে খরচ হওয়া, চীনের আর্থিক ঋণে হাম্বানতোতা সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পর সেই অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতার দায়ে বন্দরটি ৯৯ বছরের জন্য চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত একটি কম্পানির কাছে সমর্পণ করতে বাধ্য হওয়া, এক অর্থে দেশটির সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপোশ করার শামিল। সেই সঙ্গে চীনের পক্ষ থেকে ক্রমাগত দেনা পরিশোধের চাপ সামলাতে রনিল বিক্রমাসিংহের ব্যর্থতার জুতসই বিকল্প হিসেবে রাজাপক্ষে ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। কিন্তু বিষয়টি যতটা সহজভাবে তিনি করলেন তা আসলেই সহজ নয়। শ্রীলঙ্কার ২২৫ আসনবিশিষ্ট সংসদে বিক্রমাসিংহের শ্রীলঙ্কান ফ্রিডম পার্টির দখলে রয়েছে ১০৬টি আসন (এর মধ্যে তিনটি ক্ষুদ্র দলের রয়েছে ১৯টি)। অন্যদিকে সিরিসেনার ইউনাইটেড পিপলস ফ্রিডম অ্যালায়েন্স এবং রাজাপক্ষের দলের মিলে সম্মিলিত আসন সংখ্যা ৯৫, অর্থাৎ কোনো পক্ষেরই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৩টি আসন নেই। এর আগে সিরিসেনার দল কর্তৃক আনীত আস্থা ভোটে পরাজয়ের পরপরই তড়িঘড়ি করে গত ২৬ অক্টোবর সিরিসেনা প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহকে বরখাস্ত করে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজাপক্ষেকে শপথবাক্য পাঠ করান এবং আগামি ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত সংসদের অধিবেশন স্থগিত করেন। সংগত কারণেই পদচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বিষয়টিকে অসাংবিধানিক হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তিনি সংসদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করে তাঁর দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের সুযোগদানের দাবি করে আসছেন। এসব দাবিতে উত্তাল রয়েছে কলম্বোর রাজপথ। বিক্রমাসিংহের জন্য বরাদ্দ সরকারি বাসভবন থেকে সরকারি গাড়ি এবং নিরাপত্তা সদস্যদের প্রত্যাহার করা হলে তিনি সরকারি বাসভবন ছাড়তে অস্বীকার করেন এবং হাজার হাজার সমর্থক নিয়ে তাঁর বাসভবনে অবস্থান করেন। এদিকে গত ২৮ অক্টোবর দেশটির বিলুপ্ত সরকারের জ্বালানিমন্ত্রী অর্জুনা রানাতুঙ্গা রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত অমান্য করে তাঁর সরকারি অফিস সিলন পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে ঢুকতে গেলে নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী রাজাপক্ষের সমর্থকদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হলে তাঁর দেহরক্ষীর ছোঁড়া পাঁচ রাউন্ড গুলিতে রাজাপক্ষের একজন সমর্থক নিহত ও অন্য দুজন আহত হলে পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এখানে পদচ্যুত বিক্রমাসিংহের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ প্রদানের দাবি যেমন যৌক্তিক, একইভাবে অনাস্থা ভোটে পরাজিত হওয়ার পর তাঁকে বরখাস্ত করে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তও সঠিক। তবে এখানে মনে রাখতে হবে যে এ ক্ষেত্রে প্রায় তিন সপ্তাহের জন্য সংসদের অধিবেশন স্থগিত করাটাই মূল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নতুন করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ১০৬ আসন নিয়ে বিক্রমাসিংহের জন্য যতটা কঠিন, ৯৫ আসন নিয়ে সিরিসেনা-রাজাপক্ষে জোটের জন্যও খুব সহজ নয়। আর এ ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিছু ক্ষুদ্র দল, যারা এ মুহূর্তে দর-কষাকষিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচকরা এবং বিক্রমাসিংহের সমর্থকরা অভিযোগ করেছেন যে এই সময়ের মধ্যে নতুন সরকার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে পর্দার অন্তরালে কাজ করবে এবং বিক্রমাসিংহ সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন।

এখানে দুটি ছোট দল দ্য তামিল ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সের রয়েছে ১৬টি আসন এবং তারা এখন পর্যন্ত স্থির করেনি যে তারা কোন পক্ষকে সমর্থন দেবে এবং দ্য মার্ক্সিস্ট জেভিপির রয়েছে ছয়টি আসন, যারা এরইমধ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে। সুতরাং ১৬ তারিখের পর যখন আবার সংসদের অধিবেশন আরম্ভ হবে তখন যে রাজাপক্ষের নতুন সরকার পার্লামেন্টের আস্থা ভোটে উতরে যাবে সে রকম জোরালো সম্ভাবনার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। আবার পরিস্থিতির চাপে যদি প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়, তবে কি তখন তিনি সেটা করবেন নাকি মন্দের ভালো বিবেচনায় সংসদ ভেঙে দেবেন সেটাও বিবেচনার বিষয়।

শ্রীলঙ্কার এমন পরিস্থিতিতে পদচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ভারতের সহায়তা কামনা করেছিলেন। ভারত এ ব্যাপারে পশ্চিমা সিদ্ধান্তের সঙ্গে সমন্বয় করে ধীরে চলো নীতি অবলম্বনের পক্ষপাতী। অন্যদিকে চীন অনেকটাই প্রকাশ্যে এমন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের সদ্যঃসমাপ্ত নির্বাচনে তাদের সমর্থিত প্রার্থী আবদুল্লাহ ইয়ামিনের পরাজয়ের পর।

প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন পাঁচ বছর ধরে চীনের সহায়তায় দেশটিতে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড় এবং কারারুদ্ধ করে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। চীনপন্থী ইয়ামিনের বিপরীতে বিরোধী পক্ষের নেতাদের মধ্যে ভারতপন্থীর সংখ্যাধিক্যের কারণে এবং সদ্যঃসমাপ্ত নির্বাচনে তাদের একাট্টা হওয়া এক নীরব বিপ্লবের সৃষ্টি করে, যা প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের পতনকে ত্বরান্বিত করে ভারতপন্থী ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহর বিজয় নিশ্চিত করে।

চীনের বিগত বছরগুলোতে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) উদ্যোগের মাধ্যমে ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারে বড় রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় না গিয়ে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোতে আর্থিক বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে সেখানে তাদের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করা বেশি লাভজনক। এ ক্ষেত্রে মালদ্বীপের নির্বাচন থেকে যে ধাক্কাটা তারা খেয়েছে তা সামলাতে তড়িঘড়ি করে শ্রীলঙ্কায় যে রাজনৈতিক পরিবর্তনে মদদ জোগাচ্ছে তার জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে রাজাপক্ষেকে।

দেশটির জনসাধারণের মধ্যে এমন ধারণা দানের চেষ্টা করা হচ্ছে যে রাজাপক্ষের পক্ষে আর্থিক দৈন্যদশা কাটাতে নতুন করে বিপুল পরিমাণ চীনা অর্থের প্রবেশ ঘটবে। আজকের এই দৈন্যদশার মূল বীজ রোপিত হয়েছিল রাজাপক্ষের ২০০৫-২০১৫ শাসনামলে এবং এর সম্পূর্ণ দায় এসে পড়েছিল বিক্রমাসিংহের বিগত তিন বছরের প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদে। ঋণে জর্জরিত শ্রীলঙ্কা চীনের এই ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে নিজেকে কিভাবে মুক্ত করবে তার আশু সদুত্তর দুরূহ।

ফরিদুল আলম
সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমানে বেইজিংয়ের ইউআইবিইতে উচ্চশিক্ষারত



মন্তব্য