উপ-সম্পাদকীয়

বৈষম্যহীন এমপিওভুক্তির প্রত্যাশা

দেশে হাজার হাজার ননএমপিও শিক্ষক, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিবন্ধিতদের বঞ্চিত করে শিক্ষামন্ত্রণালয় সেকায়েপভুক্ত অতিরিক্ত শ্রেণি শিক্ষকদের (এসিটি) এমপিওভুক্ত করতে যাচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসিটিদের এমপিওভুক্তি নিঃসন্দেহ ভালো উদ্যোগ। তবে নন-এমপিও শিক্ষকদের অভুক্ত রেখে এবং শিক্ষক নিবন্ধিতদের বেকার রেখে এই এমপিও জাতির জন্য কতটুকু মঙ্গলকর তার হিসেব করা দরকার। বছরের পর বছর বেতন-ভাতাহীন নন-এমপিও শিক্ষকগণ শিক্ষার আলোক বর্তিকা জ্বালিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু নিজের ঘরেই তাদের আলো জ্বালানোর সামর্থ নেই। প্রতিটি দিন তাদের লাগামহীন চাহিদার সাথে যুদ্ধ করে চলতে হচ্ছে এমপিওভুক্তির আশায়। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেবা দেয়ার পর সংসারের অন্যান্য কাজ আদৌ করতে পারছেন না। বয়সের কারণে, পরিবার-পরিজনের কারনে পারছেন না অন্য চাকরির সন্ধান করতে। অতঃপর কোন রকমে গিনিপিগের মতো জীবন-ধারণ করে সমাজে টিকে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে শিক্ষক নিবন্ধিতরা শিক্ষক হওয়ার মনোবাসনা নিয়ে তাকিয়ে আছে এনটিআরসিএ`র দিকে। শিক্ষক নিবন্ধিতদের অনেকেই আর্থিক সংকটের কারণে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এতদিন শিক্ষকতার চাকরিটুকু নিতে পারেনি। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির শিক্ষক নিয়োগে একচ্ছত্র ক্ষমতা খর্ব করে বর্তমান সরকার ২০১৫ সালে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ এনটিআরসির কাছে ন্যস্ত করে। তরুন মেধাবি শিক্ষক নিবন্ধিতরা স্বপ্ন দেখে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক হওয়ার। কিন্তু উপজেলা কোটার কারণে সিংহভাগ সনদধারী বঞ্চিত হয়। শুধু তাই নয় প্রায় পনেরো হাজার পদের বিপরীতে এনটিআরসিএ মাত্র সাত হাজার নিবন্ধন সনদধারীকে নিয়োগ দিতে সক্ষম হয়। এনটিআরসিএ`র জগাখিচুরি মেধাতালিকা থেকে ঝরে পড়ে প্রায় আট হাজার নিবন্ধন সনদধারি। এরপর মামলার কারনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ আরো দুই বছর স্থগিত থাকার পর মহামান্য হাইকোর্র্টের নির্দেশনায় চলতি বছর নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু হলেও এনটিআরসিএ কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বরং চেয়ারম্যান নিয়োগের নাটকীয়তায় ক`মাস অতিবাহিত হলেও আজ পর্যন্ত বদলিকৃত দুই কর্মকর্তার কেউই যোগদান করেনি। ফলে নিয়োগ ব্যবস্থা চালু হলেও এনটিআরসিএ`র কার্যক্রমে অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠেনি। বরং বেশির ভাগ শিক্ষক নিবন্ধিত এমপিও নীতিমালা/১৮ এর আলোকে বয়স নির্ধারণের শংকায় আতঙ্কিত। এদিকে ননএমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওভুক্তিকরণেও কোন অগ্রগতি নেই। অথচ সেকায়েপ প্রকল্পের পাঁচহাজার দুইশো অতিরিক্ত শিক্ষকের এমপিও নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৌড়ঝাপ শুরু হয়ে গেছে। নন-এমপিও শিক্ষকদের রেখে এসিটি প্রকল্পের শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির উদ্যোগ শিক্ষিত বেকারদের মাঝে বৈষম্যের সৃষ্টি করেছে।
অনেকের মতে মন্ত্রনালয় কর্মকর্তাদের নিশ্চয়ই নিকটাত্মীয় আছে যার জন্য সব ফেলে শুধু এসিটিদেরই এমপিও কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে।
জানা গেছে এসিটিদের কিছু সংখ্যক দারুল ইহসানসহ কিছু অখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ প্রাপ্ত। হয়তো এ কারণেই গত ২৮ আগস্ট শিক্ষামন্ত্রনালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-৩ শাখার উপসচিব কামরুল হাসান উচ্চ আদালতের আদেশ মোতাবেক দারুল ইহসানের সনদ গ্রহনযোগ্যতার বিষয়ে স্কুল ও কলেজ ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করার স্বাক্ষরিত আদেশ প্রদান করেন। তার অর্থ কি দাড়ায়? সাধারণের মনে প্রশ্ন জাগে অনৈতিক কাজের বৈধতা দিতে এ উদ্যোগ নয়তো আবার?

কিন্ত এনটিআরসিএ ২৮ জুলাই শিক্ষামন্ত্রনালয়ে একটি চিঠি প্রেরণ করে যে- নতুন প্রতিষ্ঠান পাঠদান অনুমতির জন্য অবশ্যই নিবন্ধিত শিক্ষক থাকতে হবে। তাহলে অনিবন্ধিত কেউ শিক্ষক হওয়ার যোগ্য হতে পারেনা। এসিটিদের মধ্যে অনেকে আছেন যাদের শিক্ষক নিবন্ধন নেই। তাহলে মন্ত্রনালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কীভাবে নীতিমালা/আইন ভঙ্গ করে অনিবন্ধিত কাউকে শিক্ষক হিসেবে এমপিও`র সুপারিশ করতে পারে? দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি মহামান্য রাষ্ট্রপতিও নিয়ম নীতির বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারেনা। তাহলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে কীভাবে এরকম অনিয়ম করতে পারে আর সেখানে একজন প্রজ্ঞাবান মন্ত্রীও এই নিয়মহীন সিদ্ধান্তে তার মত প্রদান করেন? বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুসারে কোন ব্যক্তিকে নিবন্ধন সনদ ছাড়া বর্তমানে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার বিধান নেই। তাহলে আইন প্রণয়নকারি হিসেবে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের বিষয়টি আরো যাচাই করা অত্যাবশক ছিল।
এদিকে ননএমপিও শিক্ষকরা এ যাবত বহু আন্দোলন করেছে, বহুবার এমপিওভুক্তির আশ্বাসও পেয়েছে কিন্তু তা বাস্তবে পরিণত হয়নি। এজন্যই ননএমপিও শিক্ষকদের আন্দোলনের সময় তিনি অনেকবার ননএমপিও প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিও করার আশ্বাস দেন যা পরবর্তীতে মিথ্যাবাদি রাখাল বালকের মতো অবস্থা হয়েছিল যেখানে শিক্ষকরা তার কথার ভিত্তি না পেয়ে তাকে আন্দোলন থেকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে কর্মকর্তারা শুরু থেকেই বিমাতাসুলভ আচরণ করে আসছে। কিন্তু তাদের একটি কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, স্বাধীনতার পরে কিংবা আগে নাম কয়েকটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল যেগুলোর মাধ্যমে আজকের বাংলাদেশ এ পর্যায়ে আসতে পারার কথা নয়। দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে প্রায় ৯৭ ভাগ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষা বিস্তারে নিরলসভাবে অবদান রেখে যাচ্ছে। এগুলো অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। আজ প্রশাসনের উচ্চ স্তরে যারা আছেন তারাও কোন না কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা অর্জন করেছেন। প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে এসে অতীত ভুলে যাওয়াটা ঠিক গরীবের ঘরে জন্ম নেওয়া উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার মতো। যিনি বড় অফিসার হয়ে পরবর্তীতে নিজের পিতা-মাতাকে অন্যের নিকট কাজের লোকের পরিচয় দেন।

জ্ঞানীজনের প্রশ্ন- এত সব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিও পাওয়ার যোগ্য না হলে তাদের কেন অনুমোদন, স্বীকৃতি দেয়া হলো? কেনই বা একজন তরুণকে স্বপ্ন দেখালেন শিক্ষক হবার যে ননএমপিও প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতে করতে প্রৌঢ় বয়সে পৌছেছেন। আবার অনেকে ননএমপিও ভুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে করতে বেতন ভাতা না পেয়েই অবসরে গেছেন। নন এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এই চিত্র হলে এতসব প্রতিষ্ঠান চালু করার আগে বন্ধ করার কেন আদেশ দেয়া হলো না? আপনারা সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে এসমস্ত অযোগ্য প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, স্বীকৃতি এবং শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পকেট ভর্তি করবেন আর ননএমপিও শিক্ষকরা বেতন-ভাতা দাবী করলে যোগ্য প্রতিষ্ঠানের সাফাই গাইবেন এটা কোন নীতিতে পড়ে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষনপ‚র্বক বলতে চাই এই কর্তা ব্যাক্তিদের হঠকারি সিদ্ধান্ত সরকারের উন্নয়নে বাধার কারণ হতে পারে । আপনার যথাসময়ে যথাব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবী। ননএমপিও শিক্ষক এবং নিয়োগবঞ্চিত শিক্ষক নিবন্ধিত যুবকদের চাপা ক্ষোভ বড় আন্দোলনে পরিণত হওয়ার আগেই জাতিকে বৈষম্যহীনভাবে এগিয়ে নেওয়ার সঠিক পদক্ষেপ গ্রহনের প্রত্যাশা সকলের।

ভূপেন্দ্র নাথ রায়,
অধ্যক্ষ,
সাইডিরিয়্যাল মডেল স্কুল এ্যান্ড কলেজ(এসএমএসসি),
খানসামা, দিনাজপুর।
মোবাইল: ০১৭১২৯৭৯৬৫৫।

 




মন্তব্য