উপ-সম্পাদকীয়

মানুষের কল্যাণে রক্ত ও মরণোত্তর চক্ষুদান

সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই মানুষ বিপদে-আপদে একে অন্যের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। দুস্থ মানবতার পাশে এসে দাঁড়ানো এবং ব্যথিতজনের দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা এবং হাহাকার দূর করে মুখে হাসি ফোটানোই হলো মহৎ হৃদয়ের মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম। আজকের দিনে অন্যের জীবন বাঁচাতে ‘স্বেচ্ছায় রক্তদান’ কর্মসূচি মানবতার নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে। নিজের রক্ত দিয়ে অন্যের জীবন বাঁচানোর উদ্যোগ মানুষকে মানবতাবোধে সমৃদ্ধ করে তোলে।

১৯৭৮ সালের ২ নভেম্বর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে সন্ধানী আয়োজন করে দেশের সর্বপ্রথম স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি; যাতে ২৭ জন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় রক্তদান করে। ওই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৯৪ সালে তৎকালীন সরকার ২ নভেম্বরকে ঘোষণা করে জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস হিসেবে। দেশে স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম অগ্রপথিক সন্ধানী। অসহায় দুস্থদের সহায়তার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

এই কার্যক্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ সন্ধানী ২০০৪ সালে লাভ করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ‘স্বাধীনতা পদক’। বর্তমানে সন্ধানী ছাড়াও রেড ক্রিসেন্ট, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, বাঁধনসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন স্বেচ্ছায় রক্তদান নিয়ে কাজ করছে।

রক্তদাতার শ্রেণিবিন্যাস করলে আমরা দেখি-১. পার্টি ডোনেশন অর্থাৎ যখন ডোনার জানেন তিনি কাকে রক্ত দিতে যাচ্ছেন বা দিচ্ছেন। ২. প্রফেশনাল ডোনেশন, যিনি রক্ত অর্থের বিনিময়ে দান করেন, একসময়ে এঁদের সংখ্যাই আমাদের দেশে বেশি ছিল, এখন তা অনেক কমে এসেছে। ৩. স্বেচ্ছায় ডোনেশন, যিনি জানেন না কাকে রক্ত দিচ্ছেন। একটি দেশের রক্তের চাহিদা এঁরাই পূরণ করেন।

প্রফেশনাল ডোনারের সংখ্যা কমানোর চেষ্টায় একসময় প্রচলিত ছিল রক্ত নিকটবর্তী আত্মীয় থেকে নেওয়ার জন্য। কিন্তু একসময় দেখা গেল এতে ভবিষ্যৎ আরো অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। ছেলে মাকে রক্ত দিয়েছিল একসময়, পরবর্তী সময়ে মায়ের শরীরে সেই রক্তের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। তাই ছেলে মাকে রক্ত দিলেই সমস্যা হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, ছেলের থেকে মা কোনো অঙ্গ গ্রহণ করতে পারছেন না। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জাপানে প্রতি ৭০ হাজারে একটি ব্লাড রিজেকশন হয়। কারণ তাদের জেনেটিক্যাল সিমিলারিটি খুবই বেশি। আমরা সেই রকম না বলে অনেক ভাগ্যবান। এ কারণে স্বেচ্ছায় রক্তদাতার বিকল্প আসলেই কম।

আবার চাইলে সবাই রক্ত দিতে পারে না। নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে এর জন্য। বাংলাদেশ সরকার আইন করে তা নির্ধারণ করে দিয়েছে-
অ্যাবরশন হলে ছয় মাস, রক্ত পরিসঞ্চালন করলে ছয় থেকে ১২ মাস, সার্জারি ছয় থেকে ১২ মাস, টাইফয়েড হলে রোগমুক্তির পর ১২ মাস, ম্যালেরিয়া হলে তিন মাস (এনডেমিক) ও তিন বছর (নন-এনডেমিক), ট্যাটু মার্ক করলে ছয় মাস, ব্রেস্টফিডিং করলে সন্তান জন্মের পর ছয় থেকে ১২ মাস, দাঁত ওঠালে দুই সপ্তাহ, চর্মরোগ (একজিমা) হলে আরোগ্য লাভ পর্যন্ত, সন্তান প্রসবের পর ছয় মাস, লোকাল ইনফেকশন হলে সেরে ওঠা পর্যন্ত, মাসিক চললে সেরে ওঠা পর্যন্ত, সাধারণ সর্দি-জ¦র হলে সেরে ওঠা পর্যন্ত, রেবিস ভেকসিনেশনের পর এক বছর, ইবিউলিগেস্নাবিউলিন ইঞ্জেকশন দিলে এক বছর, ইম্যুনাইজেশন (কলেরা, টাইফয়েড, ডিপথেরিয়া, টিটেনাস, প্লেগ) করলে ১৫ দিন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া হলে ছয় মাস ইত্যাদি।
রক্তদান করার পর রক্তদাতাকে কী উপদেশ দেওয়া উচিত

১. আধাঘণ্টার মধ্যে ধূমপান করবেন না। ২. পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পানি খাবেন। ৩. স্বাভাবিক কাজ করবেন, ভারী কাজ করা থেকে বিরত থাকবেন। ৪. পরবর্তী চার ঘণ্টা গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকবেন। ৫. স্বাভাবিক খাবার খাবেন। ৬. মাথা ভারী লাগলে বা ঝিমঝিম লাগলে বসে পড়ে মাথা দুই পায়ের মাঝে দিয়ে নিচু হয়ে থাকবেন, তাতেও ভালো না লাগলে নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করবেন। ৭. ছয় মাসের মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ ধরা পড়লে যে স্থানে রক্ত দান করেছেন সেখানে যোগাযোগ করে জানাতে হবে।
আমাদের দেশের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরে আট লক্ষাধিক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে মাত্র দুই লক্ষাধিক পূরণ করে স্বেচ্ছায় রক্তদান। শ্রীলঙ্কার মতো দেশে যেখানে স্বেচ্ছায় রক্তদাতার হার প্রায় ৯৫ শতাংশের বেশি, সেখানে আমাদের দেশে তা বলতে গেলে একেবারেই নগণ্য।

স্বেচ্ছায় রক্তদান আমাদের দেশে মোটামুটি সাড়া ফেলতে পারলেও মরণোত্তর চক্ষুদানের ক্ষেত্রে আমরা এখনো পিছিয়ে আছি। দেশের মরণোত্তর চক্ষুদান কর্মসূচির পথিকৃৎ সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি যাত্রা শুরু করে ১৯৮৪ সালের ২৫ নভেম্বর। এটি সম্পূর্ণ অলাভজনক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। আমাদের দেশে অন্ধত্বের অন্যতম কারণ কর্নিয়াজনিত অন্ধত্ব। এর সংখ্যা প্রায় ছয় লাখ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনই সন্ধানীর লক্ষ্য। চোখের ওপর যে স্বচ্ছ, কালো, গোলাকার ও পুনঃস্থাপনযোগ্য পর্দা থাকে তাকে কর্নিয়া বলে। কর্নিয়াজনিত অন্ধত্ব সম্পূর্ণই নিরাময়যোগ্য।

কর্নিয়াজনিত অন্ধত্বের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিটামিন ‘এ’র অভাব, কর্নিয়ায় সংক্রমণ, আঘাত ইত্যাদি। এ ধরনের অন্ধত্ব দূর করতে বর্তমানে দেশের মোট মৃত্যুর ১.৫ শতাংশ কর্নিয়া সংগ্রহই যথেষ্ট। জাতি-বর্ণ-ধর্ম-নির্বিশেষে সব ব্যক্তিই কর্নিয়া দান করতে পারবে। এমনকি চোখের যেকোনো ত্রুটি থাকলেও কর্নিয়া দান করা যাবে। তবে যারা এইডস, ভাইরাল হেপাটাইটিস, জলাতঙ্ক, সিফিলিস, ধনুষ্টঙ্কার ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে, তাদের মরণোত্তর কর্নিয়াদানের অনুপযুক্ত ধরা হয়।

উন্নত বিশ্বে বর্তমানে অনেক সচেতন লোক মরণোত্তর কর্নিয়া দান করে অমরত্ব লাভ করেছেন। আমাদের দেশে মরণোত্তর চক্ষুদানের ক্ষেত্রে অনগ্রসরতার অন্যতম কারণ চক্ষুদানের ক্ষেত্রে আমাদের জ্ঞানের অভাব, ভয়ভীতি এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এর বৈধতা সম্পর্ক না জানা। অতীতে কর্নিয়া সংগ্রহের জন্য মৃতদেহ থেকে সম্পূর্ণ চোখ তোলা হতো। এর ফলে মৃত ব্যক্তির চেহারার বিকৃতি ঘটত এবং যা ছিল অনেকের কাছে দৃষ্টিকটু। বাংলাদেশের আইনে অন্ধত্ব মোচন (চক্ষুদান) অর্ডিন্যান্স ১৯৮৫-তে বলা আছে, একজন ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তাঁর চোখ দুটি মৃত্যুর পর সংগ্রহের জন্য অনুমতি দিতে পারেন।

এমনকি জীবিত অবস্থায়ও কেউ তাঁর চোখ সংস্থাপনের জন্য শর্ত সাপেক্ষে দান করতে পারবেন, সে ক্ষেত্রে একটিমাত্র চোখ দান করতে পারবেন। ধর্মীয়ভাবে এতে কোনো বিধি-নিষেধ নেই। প্রতিটি ধর্মেই বলে, মানবকল্যাণে মানুষ তার যেকোনো অঙ্গ দান করতে পারে। মক্কাভিত্তিক ইসলামি ফিকাহ একাডেমি বলেছে, মরণোত্তর অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ বা সংস্থাপন শরিয়তবিরোধী নয়। মৃত্যুর চার থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে চোখের কর্নিয়া সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হয়।

প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজারের বেশি কর্নিয়ার প্রয়োজন হয়। তবে বছরে তিন শর বেশি কর্নিয়া পাওয়া যায় না। তরুণদের আমরা যেমন রক্তদানে উৎসাহ জোগাতে পারছি, তেমনি সবাইকে জানাতে পারলে কর্নিয়ার এই বিপুল চাহিদাও অনেকটা পূরণ করা সম্ভব হতো।

ডা. আশরাফুল হক
ট্রান্সফিউশন মেডিসিন স্পেশালিস্ট




মন্তব্য