উপ-সম্পাদকীয়

প্রেরণায় বঙ্গবন্ধু

আগস্ট মাস, শোকের মাস; শোককে শক্তিতে পরিণত করে অসাম্প্রদায়িক সমৃদ্ধ দেশ ও জাতি গঠনে অশুভ ষড়যন্ত্রীদের বেড়াজাল ছিন্ন করে দৃপ্ত শপথে সামনে এগিয়ে চলার মাস। ইতিহাসের বেদনাবিধুর ও বিভীষিকাময় একটি দিন, ১৫ আগস্ট। আমাদের জাতীয় শোক দিবস। শোকাবহ এ দিনে পুরো বাঙালি জাতি গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ শাহাদতবরণকারী তাঁর পরিবার সদস্যদের। ১৯৭৫ সালের এই দিনের কাক ডাকা ভোরে সেনাবাহিনীর উশৃঙ্খল ও বিপথগামী একদল সেনা সদস্যের হাতে নৃশংসভাবে প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তাঁর ৩ পুত্র, ২ পুত্রবধূ, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি, কৃষক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাতসহ অনেকে। আল্লাহর অশেষ রহমত ও কৃপায় এই নৃশংসতার হাত থেকে সেদিন বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা। স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে জার্মানিতে সন্তানসহ অবস্থান করছিলেন শেখ হাসিনা। ছোট বোন রেহানাও তাঁর সঙ্গে থাকায় আল্লাহর কৃপায় সেদিন এই দু’ বোন বেঁচে যান।
একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক জাতি গঠনের স্বপ্ন নিয়ে বঙ্গন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদেরকে উপহার দিয়েছিলেন একটি স্বাধীন দেশ, লাল-সবুজের পতাকা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে ধুলিস্যাৎ করে দিতে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা সেদিন এক হয়েছিল। ষড়যন্ত্রকারীরা এই নৃশংস আঘাত হেনে দেশকে সাময়িক পিছিয়ে দিতে সক্ষম হলেও অবশেষে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আবার ঘুড়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। জাতি আজ যেমন তার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে তেমনি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ছায়াতলেও সবাই একাট্টা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন অসাম্প্রদায়িক উন্নত দেশ গড়ার মিছিলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাওয়ার পথে আজ সকল মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীরা একতাবদ্ধ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যার ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নের পাশাপাশি ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার মিশন এখন দেশের সাধারণ জনগণের চাওয়া। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে দেশের সাধারণ মানুষ সবসময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন আজন্ম স্বাধীন চেতা মানুষ। তিনি যা বিশ্বাস করতেন তাই তিনি করতেন। যে দেশটি তিনি স্বাধীন করেছেন সে দেশের কোনো বাঙালি যে তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে এটা তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি। তাইতো তিনি আগাম সতর্কতাকে আমলে না নিয়ে বঙ্গবভনের পরিবর্তে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের নিজের বাড়িতেই বিশ্বাসের সঙ্গে অবস্থান করেন। তার বিশ্বাসকে পুঁজি করে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা সহজ টার্গেটে পরিণত করে কাপুরুষোচিতভাবে তাকে এবং তাঁর পরিবারকে হত্যা করে। লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত অবস্থায় ঘাতকের বুলেটের সামনে বুক পেতে দেন স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন ঘাতকদের মেশিনগানের মুখেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন অকুতোভয়। ঘাতককে প্রশ্ন করেছিলেন, “তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?” কেউ যে তার বুকে গুলি চালাতে পারবে এটা তিনি এক মুহূর্ত আগেও ভাবতে পারেননি। এর মূল কারণটি ছিল দেশের মানুষের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস। আজীবন সংগ্রাম করে যাদের জন্য একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন তাদের কেউ কি তাকে হত্যা করতে পারে?

ছাত্র অবস্থায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া শেখ মুজিবুর রহমান ’৫২ র ভাষা আন্দোলনে একজন সংগ্রামী নেতা। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফার প্রণেতাও ছিলেন তিনি। ষাটের দশক থেকেই তিনি পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭০’র নির্বাচনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে এদেশের গণমানুষের আশ-আকাক্সক্ষা ও নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত করেন। ১৯৭১ সালের সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো লাখো জনতার উত্তাল সমুদ্রে বঙ্গবন্ধু বজ্রদৃপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। তার বজ্রকণ্ঠে আগামী দিনের কর্মসূচিসহ যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য ছিল, সেটাই ছিল মুলত স্বাধীনতার ঘোষণা। এই ঘোষণায় উদ্দীপ্ত হয়ে ছাত্র সমাজ, কৃষক-শ্রমিক, পেশাজীবী, রাজনীতিক, সংস্কৃতিকর্মী, যুব-কিশোর, নারী-পুরুষ তথা পুরো বাঙালি জাতি পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ছিলো : “তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।” তার এই ভাষণ শোনার পর থেকেই এদেশের শোষিত-নিপীড়িত-বঞ্চিত বাঙালির রক্তে শিহরণ বইতে শুরু করে। মুক্তিকামী মানুষ দলে দলে মুক্তিযুদ্ধের দিকে নিজেদের সংগঠিত করে বিভিন্ন দলে-উপদলে ভাগ হয়ে পাক হানাদার মোকাবেলায় নেমে পড়ে।
আমি তখন তরুণ ছাত্র নেতা, বরিশাল বিএম কলেজের ভিপি। ছাত্রনেতা হিসেবে বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে ছাত্র-যুব সমাজের মাঝে তখন আমার ব্যাপক পরিচিতি ও প্রভাব ছিল। শুধু বিএম কলেজই নয়, বরিশালের আরও ৫টি কলেজের ছাত্র সংসদের নেতৃত্ব ছিল আমার দেয়া প্যানেলের। সে কারণে গোটা বরিশালের ছাত্র রাজনীতিতে আমার একটি সংগ্রামী অবস্থান ছিল। ছাত্র নেতা থেকে আজকে আমার বর্তমান অবস্থান, ৬ বার এমপি নির্বাচিত হওয়া এবং বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা কর্তৃক ২০০৮ সালে হুইপ এবং ২০১৪ সালে চীফ হুইপের দায়িত্ব পাওয়া এটা রাজনীতিতে আমার জনগণের দেয়া সম্মান ও নেত্রীর বিশ্বস্ততার কারণেই সম্ভব হয়েছে।
আমি ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে ছাত্রমিছিলে অংশগ্রহণ করি। ১৯৬৬ সালে বরিশাল এ.কে. স্কুলের নির্বাচিত সহ-সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় ৬ দফা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। ১৯৬৯ সনে গণঅভ্যুত্থানে বরিশালে আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রনেতা হিসেবে আমার ভূমিকা ছিল বলিষ্ঠ। ১৯৭০ সনের প্রলংকরী ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বন্যার্তদের মাঝে রেড ক্রিসেন্ট এবং আওয়ামী লীগের ত্রাণসামগ্রী নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে থেকে আমি দক্ষিণাঞ্চলের চরাঞ্চলে ত্রাণ বিতরণে অংশগ্রহণ করি। ১৯৭০ নির্বাচনের পূর্বে বঙ্গবন্ধু বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ও থানায় অনেক সভা-সমাবেশ করেন। বঙ্গবন্ধু যতবার বরিশাল অঞ্চলে গিয়েছেন ততবারই তার সফরসঙ্গী থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। তিনি যখন ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, মঠবাড়িয়া, ভান্ডারিয়া, কাউখালি এবং বাউফল সফর করেন তখন ছাত্রনেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার থাকার সুযোগ হয়। ’৭০ এর নির্বাচনের পূর্বে সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আমার নিজ গ্রাম বাউফলের কালাইয়াতে বঙ্গবন্ধু একটি সভা করেন। ঐ সভা পরিচালনার দায়িত্ব ছিল আমার। সভাশেষে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে আমার বাসায় আপ্যায়িত হন। আমাকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার উপদেশ দেন। আমার জীবনের সাফল্যের মূলে বঙ্গবন্ধুর প্রেরণা ও উপদেশ মন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। এর ঠিক দেড় মাস পরে ১২ নভেম্বর-১৯৭০ বঙ্গবন্ধু ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্থ দক্ষিণাঞ্চল সফরকালে পুনরায় কালাইয়া যান। বঙ্গবন্ধু যে ঘরে বসে মাত্র দেড় মাস আগে খাওয়া-দাওয়া করেছেন সে ঘরটি ঝড়ে বিধ্বস্থ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তখন বঙ্গবন্ধু আমার চাচাকে সান্ত¡না দিয়ে সমবেদনা জানান এবং পরবর্তীতে সাহায্য-সহযোগিতা প্রেরণ করেন। আমি বঙ্গবন্ধুর মাঝে একজন ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা বিপথগ্রস্থকে আপন করে নেয়ার অসীম ক্ষমতা দেখেছি। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন জনগণের প্রকৃত বন্ধু। তাই তিনি হয়েছেন ‘বঙ্গবন্ধু, হয়েছেন জাতির পিতা।
১৯৭০-৭৩ সময়ে বরিশাল বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি ছিলাম। ছাত্রদের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি খেয়াল রাখার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল আমার। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শোনার জন্য বরিশাল থেকে লঞ্চযোগে ঢাকা আসি। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে ছাত্রনেতাদের নিয়ে আমি রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত হই। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী দিক নির্দেশনা পাওয়ার পর আমি বুঝে নেই এটাই ‘মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা’। ছাত্রনেতা হিসেবে আমাকে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে। সবাইকে নিয়ে বরিশালে ফিরে গিয়ে পরিকল্পনা আঁটতে থাকি কীভাবে সংগ্রামের প্রতি নেয়া যায়, সকল শ্রেণী পেশার মানুষকে এই সংগ্রামে একত্রিত করা যায়? এরই মাঝে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার পরপরই সমমনা ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতৃত্বে বিশেষ করে তৎকালীন এমএনএ, এমপি সবাই একত্রে বসে মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম কমিটি গঠন করি। এই কমিটিতে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে আমি সদস্য অন্তর্ভুক্ত হই। আমি বিভিন্ন জায়গায় মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র-যুব সমাজকে একত্রিত করে সংগ্রামে উজ্জীবিত করি।
 ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। ২৭ এপ্রিল ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে ৩০ এপ্রিল ভারতে পৌঁছি। ভারতে প্রশিক্ষণশেষে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ২টি লঞ্চযোগে দেশে ফেরার পথে ৬ মে খুলনার গাবুরা এলাকায় পাকবাহিনীর গানবোট দ্বারা অতর্কিত হামলার শিকার হই। এই হামলায় ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে আমিসহ ১৯ জন মুক্তিযোদ্ধা পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে আটক হই। আটককৃতদের মধ্যে তৎকালীন সংসদ-সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন আহমেদও ছিলেন। দু’দিন আটক থাকার পর পাকিস্তান আর্মির গানবোট আসে এবং পরবর্তীতে আমাদের ১৯ জনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় আমি ও আমার বন্ধু ফুটবলার সুরুজ বোট থেকে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মরক্ষা করি। অতঃপর আত্মীয়দের সহায়তায় আমি সেখান থেকে বরিশালে আসি এবং ৩০ মে পুনরায় ভারতে গিয়ে ৯নং সেক্টরের চীফ পলিটিক্যাল মটিভেটরের দায়িত্ব পালন করি এবং বিভিন্ন ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধ ও আগামী দিনের বাংলাদেশ কীভাবে চলবে সে ব্যাপারে সকলকে উদ্বুদ্ধ করি। পরবর্তীকালে সাতক্ষীরা সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেই। ২০ নভেম্বর ঈদের দিন কালিগঞ্জ থানার পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকবাহিনীর ২ সদস্য ও ১২ রাজাকারকে আটক করে এলাকা শত্রুমুক্ত করি এবং সেখানে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি। এই যুদ্ধে মেজর হুদার নেতৃত্বে আমি, ক্যাপ্টেন বেগ, লেঃ সচিন কর্মকার, লেঃ আহসান ও লেঃ মাইনুলসহ অনেকে অংশগ্রহণ করি। ১৬ ডিসেম্বর দেশ যখন স্বাধীন হয় তখন আমরা সাতক্ষীরায় ছিলাম। সেখান থেকে কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বরিশালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। আমরা তিন দিন পর বরিশাল পৌঁছি। আসার পথে সুন্দরবন এলাকার সাব-সেক্টর কমান্ডার প্রয়াত মেজর জিয়ার সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়।
৩০ লাখ শহীদের রক্ত এবং নিপীড়িন-নির্যাতনের শিকার লাখো মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পা রাখলেন আমিও তরুণ ছাত্রনেতা হিসেবে তাকে সংবর্ধনা-অভিনন্দন জানাতে সেখানে উপস্থিত ছিলাম। বিমান বন্দর থেকে যে ট্রাকটিতে করে বঙ্গবন্ধু আসেন সেটাতে তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে ছাত্রনেতা হিসেবে আমিও আল্লাহর অশেষ রহমতে সহযাত্রী হতে পারিনা এটা আমার জীবনের একটি সৌভাগ্য মনে করি। সেদিন দেখেছি জনসমুদ্র কী রকম হতে পারে? বিমান বন্দর থেকে পুরো রাস্তা লোকে লোকারণ্য। গাছের উপরে, ছাদের উপরে সবখানেই মানুষে ঠাসা। মানুষের ভিড় ঠেলে মিডিয়াকর্মীদের বহনকারী গাড়িটি যথাসময়ে সামনে আসতে না পারায় ঐ সংবাদ কভার করতে যাওয়া ফটোসাংবাদিকরা ছবি তুলতে পারেনি। যে কারণে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের অধিক সংখ্যক ছবি পাওয়া যায়নি। মনে পড়ে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হিসেবে এখনও যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদের মধ্যে আছেন জনাব তোফায়েল আহমেদ এবং জনাব নূর-ই-আলম সিদ্দিকী, যাঁরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত  আছেন। এছাড়া ছিলেন আসম আবদুর রব ও শাহজাহান সিরাজ। তারা অবশ্য এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। মনে পড়ে, সোনারগাঁও হোটেল পার হয়ে বাংলামটরের কাছাকাছি পৌঁছতেই বঙ্গবন্ধুর পানির পিপাসা লাগে। পানির জন্য  আশপাশে ছোটাছুটি শুরু করি। কিছু দূরে মসজিদের কাছে একটি ছোট দোকান দেখতে পেয়ে সেখানে চলে যাই। তখনকার সময়ে বোতলজাত পানি ছিল না। বঙ্গবন্ধুর জন্য দোকান থেকে সেভেনআপের একটি কেস ও একটি ওপেনার নিলাম। দোকানীকে টাকা দিতে গেলে তিনি বঙ্গবন্ধুর জন্য পানি নিচ্ছি জেনে দাম নিতে অস্বীকৃতি জানান। আমি নিজেই সেভেনআপের কেসটি বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে তুলে দেই। বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ট্রাকে আমি ছিলাম চালকের পাশে। তখন আমার পাশে ছিল জগন্নাথ কলেজের তৎকালীন ভিপি এমএ রেজা এবং ময়মনসিংহের আওয়ামী লীগের এমপি শামসুল হক। মাঝখানে ছিলাম আমি।
জননায়ক ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সংবেদনশীল। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে যে কোনো ব্যক্তি অনায়াসে পৌঁছে যেতে পারতেন তাঁর কাছে। কূটনীতি ও রাষ্ট্রাচারের ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুর বিশাল ব্যক্তিত্ব ও সহনশীল আচরণ পরিলক্ষিত হয়েছে। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছিলেন, “আমি হিমালয় দেখেনি, কিš‘ শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্বে, সাহসিকতায় এই মানবই হিমালয়।”  ১৯৭১ সালের ২ মে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকা একটি নিবন্ধে লিখেছে, “সাধারণ বাঙালির কাছে তাঁর কাপড় স্পর্শ করা ছিলো তাবিজের শুভ ফল পাওয়ার মতো। তাঁর মুখের কথাই হয়ে উঠেছিল আইন। সম্পদ কিংবা পদ মর্যাদার দিকে তাঁর কোন নজর ছিলো না। সম্পূর্ণরূপে আন্তরিক ছিলেন জনগণের প্রতি। প্রতিটি বাঙালি, তিনি যতো তু”ছ বা গরিবই হোন না কেন, তিনি মানুষের মর্যাদা ও সম্মান দিয়েই বিবেচনা করতেন, সাহায্য করতেন।”
এমন এক বিশাল হৃদয়ের মহান নেতার হত্যাকা-ের পর পশ্চিম জার্মানির নোবেলজয়ী নেতা উইলি ব্রানডিট বলেছিলেন, “মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিকে আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি মুজিবকে হত্যা করতে পারে, তারা যে কোন জঘন্য কাজ করতে পারে।” বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা- কেবল তাকেই নিস্তব্ধ করেনি, ব্যাহত হয়েছে দেশের অগ্রযাত্রা। গভীর গিরিখাতের অতল অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছিল দেশের মানুষ। দিকহারা জাতি সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাবে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হয়ে আসছিল দীর্ঘদিন। যেকারণে বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠে সাম্প্রদায়িকতা, জামাত-বিএনপির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদে দেশে সৃষ্টি হয় জঙ্গিবাদ। দেশের অগ্রযাত্রার সোপানকে পেছনে ধাবিত করে স্বীকৃতি পায় জঙ্গিবাদ ও দুনীতিবাজ রাষ্ট্র হিসেবে। অবশেষে ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবার জাতি ফিরে পায় সঠিক দিক নির্দেশনা। সমৃদ্ধির পথে যুক্ত হচ্ছে একের পর এক নতুন পালক। দেশে এখন একটি শান্তিময় পরিবেশ। সরকারের উপর আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পাওয়ায় সর্বমহলে স্বস্তি বিরাজমান। আন্তর্জাতিক পরিম-লে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। বিদেশীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসছে। দেশে একটি সুস্থ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি বিশেষ মহলের অপতৎপরতায় জাতি আজ শংকিত। সকলকে সাবধান হতে হবে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে স্বাধীনতার সপক্ষের সকল শক্তিকে এক হতে হবে। আগামী দিনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে অব্যাহত সমর্থন জুগিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে সকলের সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করতে হবে। শোককে শক্তিতে পরিণত করে সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় সকলকে এক হতে হবে। আর যাতে কোনো দিন কোন অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। কোনো  ষড়যন্ত্রী, কোনো আগুন সন্ত্রাসী যেন গণতন্ত্র ও অগ্রযাত্রার পথকে ব্যাহত করতে না পারেনা এ ব্যাপারে সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।
 লেখক : আ.স.ম ফিরোজ, এমপি রাজনীতিক, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ।
 সংগ্রহে : জহির খান




মন্তব্য