শিক্ষা

বই বাণিজ্য


আল-আমিন: দেশের কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে চলছে রমরমা বই বাণিজ্য। স্কুল কর্তৃপক্ষ কমিশনের মাধ্যমে নিম্নমানের অতিরিক্ত বই নির্বাচন করছে। এতে শিক্ষার্থীদের মাথায় অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা বেড়েই চলছে। কিন্ডারগার্টেন স্কুল তৈরির নীতিমালায় বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য নয় এমন পাঠ্যপুস্তক পড়ানো নিষিদ্ধের কথা থাকলেও তারা সেটা তোয়াক্কা করছে না। তারা কোনো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়াই ইচ্ছামতো বই নির্বাচন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেশিরভাগ কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোয় সরকার নির্ধারিত পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বৃদ্ধি করা হয়েছে অতিরিক্ত আরো ৫ থেকে ১০টি স্কুল নির্ধারিত পাঠ্যবই। স্কুল ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে বই বাণিজ্যের লভ্যাংশ হাতিয়ে নিতেও নির্দিষ্ট করেছেন বইপ্রাপ্তির লাইব্রেরি। এর ফলে নির্দিষ্ট লাইব্রেরি থেকে উচ্চমূল্যে বইগুলো কিনতে বাধ্য হচ্ছেন অভিভাবকরা। 
রাজধানীর কয়েকটি স্কুলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি স্কুলেই সরকারি নির্ধারিত বই ছাড়াও অতিরিক্ত বই পড়ানো হচ্ছে। মর্নিংবেল কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বই ছাড়াও পড়ানো হচ্ছে- বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার, জ্যামিতি, অ্যাকটিভ ইংলিশ, ধর্ম, সাধারণ জ্ঞান, পরিবেশ পরিচিতি, ওয়ার্ড বুক, ড্রয়িং বুক এবং কেজিতে এনসিটিবির তিনটি বইসহ আরো কয়েকটি বই। এভাবে প্লে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসে এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অতিরিক্ত বই পড়ানো হয়, যেগুলো খুবই নিম্নমানের বই। কর্তৃপক্ষ বাড়তি লাভের আশায় শিক্ষার্থীদের এসব নিম্নমানের বই কিনতে বাধ্য করে।
কিন্ডারগার্টেন স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নাসিমা সুলতানা বলেন, সম্প্রতি আমি আমার সন্তানকে নার্সারিতে ভর্তি করিয়েছি। নার্সারির জন্য তারা সাতটি বই অন্তর্ভুক্ত করেছে। বইয়ের লিস্ট হাতে ধরিয়ে দেয়ার পর বলে দেয়া হয়েছে তাদের স্কুল লাইব্রেরি থেকে বই কিনতে হবে। তারা চার পৃষ্ঠা, ছয় পৃষ্ঠার বইগুলোর দাম রাখে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। সেখানে বইয়ের দর করার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই সংশ্লিষ্ট দপ্তর যেন বিষয়টির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর জন্য একটি স্বচ্ছ নিয়মনীতি নির্ধারণ করে সে প্রত্যাশা করছি।
আরেক অভিভাবক আতিকুর রহমান বলেন, আমার সন্তান মর্নিংবেল কিন্ডারগার্টেন স্কুলে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আমার ছেলের মোট বইয়ের সংখ্যা ৯টি। বই কেনা বাবদ খরচ করতে হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা, যে বইগুলোর দাম হওয়া উচিত ৫০০ টাকারও কম। এছাড়াও ডায়েরি ও খাতা তো আছেই। বই, খাতা এবং ডায়েরি সবকিছুই কিনতে হয় স্কুল লাইব্রেরি থেকে। তারা এমন বই নির্বাচন করে যেটা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এতে তাদের ইচ্ছামতো দাম নিয়ে থাকে।  
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্কুলের কর্তৃপক্ষ জানায়, জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠপুস্তক বোর্ডের বই যথেষ্ট নয়। বর্তমান বিশ্বে এগিয়ে যেতে চাইলে অবশ্যই বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান থাকতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে অল্প বয়সে সবকিছু জানতে পারে সেটার জন্য আমরা ভালো কিছু বই নির্বাচন করে থাকি। যেমন আমাদের স্কুলে প্রতিটি শ্রেণিতে সাধারণ জ্ঞান পড়ানো হয়, যেটা সকলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা মনে করি।  
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লাইব্রেরির কয়েকজন কর্মচারী জানান, বই প্রকাশনা কোম্পানি ও স্কুল কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে এ ধরনের বাণিজ্য হয়ে থাকে। ২০ থেকে ২৫ টাকা মূল্যের বইয়ের দাম হচ্ছে ৬০ থেকে ৮৫ টাকা। এ বই বিক্রি করে লাইব্রেরির মালিকরা ১০% থেকে ১৫% লভ্যাংশ পেলেও এর ৬০% থেকে ৬৫% লভ্যাংশ ভাগ করে নিচ্ছে এই বই বাণিজ্যে লিপ্ত বই প্রকাশনা কোম্পানি ও স্কুল কর্তৃপক্ষ।

 

মন্তব্য