শিক্ষা

পদ্ধতিগত কারণেই এগিয়ে কিন্ডারগার্টেন

আল-আমিন: কিন্ডারগার্টেন স্কুল নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা দীর্ঘদিনের। অতিরিক্ত ভর্তি ফি, স্কুলবেতন, গাড়িভাড়া, সরকারি বইয়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত বই দেওয়া, শিশুশ্রেণি থেকে নবমশ্রেণি পর্যায়ক্রমে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এরূপ মুখরোচক বাণী দিয়ে প্রতিমাসে অভিভাবকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ অসংখ্য অভিযোগ থাকে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের বিরুদ্ধে। তবুও কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রতি আস্থা রাখছে অভিভাবকেরা। কয়েক বছর আগেও কিন্ডারগার্টেন কিংবা ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাব্যবস্থা ছিল অনেকের কাছেই অপরিচিত। কিন্তু বর্তমানে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সরকারি বেশিরভাগ স্কুলগুলোতেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে না বরং কমছে। শিক্ষার্থীদের নতুন গন্তব্য হয়ে উঠেছে কিন্ডারগার্টেন। মোটামুটি স্বচ্ছল এমন বেশিরভাগ পরিবারের অভিভাবকদের একমাত্র ভরসা এখন কিন্ডারগার্টেন স্কুল। 
কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি হওয়া প্রসঙ্গে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগকে উপেক্ষা করে অভিভাবকরা শিক্ষা বাণিজ্যের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। পাড়া-মহল্লায় গজিয়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেনগুলো শিক্ষার্থী ধরতে ক্যাম্পেইন চালায়। গাইড বইয়ের ব্যবহারের পাশাপাশি নোট শিট প্রদান ও কোচিংয়ের ব্যবস্থাসহ নানা সুযোগ দেওয়ার নামে বেসরকারি এসব স্কুলগুলো শিক্ষার্থী ধরে। তারা ছোট বাচ্চাদের উপর বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয়। যাতে শিশুদের মেধা বিকাশে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চাকচিক্যই সেখানে মূলকথা বলে মনে করেন তারা।
অন্যদিকে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের পরিচালক ও শিক্ষকরা বলছে ভিন্ন কথা। হাতে কলমে ও খেলার ছলে শিক্ষা দেওয়ায় অবিভাবকরা কিন্ডারগার্টেনের দিকে ঝুঁকছে বলে দাবি আগারগাঁও কিন্ডারগার্টেন স্কুলের পরিচালক রেহেনা পারভিনের। তিনি জানান, আধুনিক পদ্ধতিতে, সুষ্ঠু পরিবেশে, যুগোপযোগী শিক্ষাদান, সহজ পদ্ধতিতে পাঠদান, শিক্ষকদের দক্ষতা ও আন্তরিকতা এবং অ্যাকাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর বাস্তব জীবনের জন্য জরুরি এমন সব আয়োজন করা হয়। যেটা শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পড়ালেখা করে শিক্ষার্থীদের বাড়ি যেয়ে বাড়তি পড়া-লেখার প্রয়োজন হয় না। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আন্তরিকতার সাথে, হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়া হয় না। ফলে সচেতন অভিভাবকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে তারা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে তাদের ছেলে মেয়েদেরকে পড়াচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
রাজধানী আগারগাঁও মর্নিংবেল কিন্ডারগার্টেন স্কুলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, এখানে ক্লাসের পড়া ক্লাসেই শেখানো হয়। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় নোট শিট দেওয়া হয়। বাসায় হোমওয়ার্ক করতে হয়। সন্তানের মা এখানে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে আমাদের এখানে আসতে আগ্রহ দেখাচ্ছে । তিনি বলেন. আমাদের এখানে ছেলে মেয়েদের পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। এছাড়াও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা, পিঠা উৎসব, শিক্ষা সফর, বিতর্ক উৎসবসহ নানা আয়োজন করা হয় যেটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে করা হয় না। 
অভিভাবক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও শিক্ষার উন্নত পরিবেশের কারণে কিন্ডারগার্টেন স্কুল আমার পছন্দ। এখানে বাচ্চাদের নিরাপত্তা ও যত্নের বিষয়টিও কমফোর্টফিল করার মতো। এছাড়া, এখানে নিয়মানুবর্তিতা ব্যবস্থাটি খুবই চমৎকার। সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয় সম্পর্কে তিনি বলেন, মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ না থাকায় তাদের সন্তানদের লেখাপড়া করানোর জন্য সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করানোর বিষয়ে আগ্রহ হারাচ্ছে তারা। 
আরেক অভিভাবক নাসিমা সুলতানার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিক্ষকদের জবাবদিহি ও আন্তরিকতার অভাবে অধিকাংশ সরকারি স্কুলে শিক্ষার মান একেবারে নড়বড়ে। দু-একটিতে ব্যতিক্রম থাকলেও প্রায় প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ দশা। তাই খরচ একটু বেশি হলেও সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চাই। এক্ষেত্রে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের বিকল্প দেখছি না।
শিক্ষাবীদদের মতে, স্কুলে উন্নত শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করার পেছনে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থীদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে যেসব স্কুলে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব আছে, সেসব স্কুলে শিক্ষক ও অভিভাবকদের দায়সারা মনোভাব সুস্পষ্ট। যার কারণে শিক্ষার উন্নত পরিবেশ সৃষ্টি ও শিক্ষার্থীদের ভালো ফল অর্জনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে ওইসব স্কুল। এ জন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান সন্তোষজনক না হওয়ার কারণে অভিভাবকেরা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে তাদের বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষনা অনুষদের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, কিন্ডারগার্টেন স্কুলের পরিবেশ ভালো হয়ে থাকে।অন্যদিকে আমাদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ভালো না। যার করনে অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়াচ্ছেন।  

 

মন্তব্য