শিক্ষা

কমছে না বইয়ের বোঝা

আল-আমিন: দেশে বর্তমানে প্রায় পঁচাত্তর হাজারের বেশি কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। সেখানে লাখ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। কিন্তু এই স্কুলগুলোর ওপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এমনকি কিন্ডারগার্টেনের সঠিক সংখ্যাও তাদের জানা নেই। কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে কী ধরনের বই পড়ানো হচ্ছে, তার তদারকিও নেই, যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জানা অতি আবশ্যক। কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে শিক্ষার নামে শিশুর ওপর মাত্রাতিরিক্ত বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয়া নতুন কোন ঘটনা নয়। সরকারী নির্দেশনায় নির্ধারিত বইয়ের বাইরে শ্রেণীকক্ষে শিশুদের বাড়তি কোন বই পড়ানোর নিয়ম না থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নির্ধারিত বই ছাড়াও কোমলমতি শিশু-শিক্ষার্থীদের হাতে বাড়তি নতুন বইয়ের তালিকা তুলে দিচ্ছেন কিন্ডারগার্টেন বা বে-সরকারি স্কুলগুলো। এতে করে অতিরিক্ত বইয়ের বোঝার কারণে কোমলমতি শিশু-শিক্ষার্থীরা শারীরিক চাপের পাশাপাশি মানসিক চাপও বয়ে বেড়াচ্ছে। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এ শিশুদের কাঁধে বইয়ের বোঝা কমানোর কথা বলা হলেও কিন্ডারগার্টেন বা বে-সরকারি স্কুলগুলোতে স্কুলগুলোতে শিশুদের মাত্রাতিরিক্ত বই পড়ানো হচ্ছে। ফলে মানসিক চাপে শিশুর মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি স্বীকার করলেও কার্যত কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। 
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী জারার মা জান্নাতুল ফেরদৌসী বলেন, বাংলা ১ম পত্র ও ২য় পত্র, ইংরেজি ১ম পত্র ও ২য় পত্র, অংক, সমাজ, বিজ্ঞান, ধর্ম-এই ছয়টি বই, সঙ্গে ছয়টি খাতা। এর সঙ্গে যোগ হয় পানির পট, আর টিফিন বক্স। এসব মিলে পিঠের ভারী ব্যাগটি তখন শিশুর শরীরের ওজনের চেয়েও বেশি মনে হয়। তিনি বলেন, কোনও বাচ্চা যদি অ্যাসেম্বলির ঠিক আগ মুহূর্তে স্কুলে পৌঁছায়, তখন সেই ভারী স্কুল ব্যাগ নিয়েই তাকে অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়াতে হয়। এমনকি দুই-তিন তলা সিঁড়ি ভেঙে ক্লাসে যেতে হয়। এত ভারী ব্যাগের কারণে শিশুদের শারীরিকভাবে সারাজীবনের জন্য আমরা বোঝা করে দিচ্ছি। গাদা গাদা বইয়ের এই সংস্কৃতি থেকে শিশুদের রেহাই দেওয়া উচিত।
অতিরিক্ত বইয়ের বিষয়ে রাজধানী ঢাকার এক কিন্ডারগার্টেন স্কুলের কর্মকর্তা বলেন, শিশুদের সঠিক শিক্ষা দিতে হলে সরকারি বই যথেষ্ট নয়। এজন্য শিশুদের সঠিক শিক্ষাদানে ভূমিকা রাখবে এমন কিছু বই নির্বাচন করে থাকি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষনা অনুষদের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম মনে করেন, বর্তমান সময়ে শিশুদের অনেক পাবলিক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এই পরীক্ষাগুলোর জন্যও পড়াশোনার আলাদা প্রস্তুতি, মডেল টেস্ট, কোচিং ইত্যাদিতে ব্যস্ত হয়ে যেতে হচ্ছে শিশুদের। ফলে শিশুদের ওপর পড়াশোনার চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, শিশুদের পড়াশোনা হওয়া উচিত বিনোদন-নির্ভর, যাতে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনা করতে পারে। সিলেবাস এমনভাবে তৈরি হওয়া উচিত যেখানে বিনোদনের বিষয়টি সম্পৃক্ত থাকে। সেজন্য প্রয়োজনে স্কুল শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 
এ বিষয়ে অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ ডা. মো. বিপুল বলেন, অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগের কারণে শিশুরা মেরুদণ্ড ও হাড়ের বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে বেড়ে উঠছে। স্কুলে যাওয়ার সময়ে ভারী ব্যাগ বয়ে নিয়ে যেতে বাচ্চাদের তেমন আপত্তি থাকে না। কিন্তু স্কুল থেকে ফিরে শরীর জবাব দিয়ে দেয়। ব্যাগের অতিরিক্ত ওজন মেরুদণ্ডে চাপ সৃষ্টি করে ঠিকই। তবে সমস্যা বেশি হয় পেশীর। আমাদের বসা, দাঁড়ানো সবার একটা আদর্শ ভঙ্গিমা আছে, যা আমাদের বক্রতা বজায় রাখে। ব্যাগের ভারে তার ক্ষতি হয়। 

 

মন্তব্য