বিশেষ খবর

ধর্ষণের নজিরবিহীন রেকর্ড

শুক্রবার রাত পৌনে আটটার দিকে ওয়ারীর বনগ্রাম মসজিদ এলাকার  নির্মাণাধীন একটি ভবন থেকে উদ্ধার করা হয় ৭ বছর বয়সের সামিয়া আফরিন সায়মার লাশ। ময়নাতদন্ত ও বিভিন্ন পরীক্ষা শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ড. সোহেল মাহমুদ জানান, শিশু সামিয়া আফরিন সায়মাকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। সায়মার মতো এমন ধর্ষণ-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা। চলতি বছর নারী ও শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন, হত্যায় রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ। এ বছর প্রথম ছয় মাসেই সারাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৩১ জন নারী ও শিশু। গতবছরের তুলনায় অর্ধেক সময়ে চলতি বছর ধর্ষণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় দেড়গুণ বেড়েছে বলে জানান বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
এসময়ে নির্যাতিত নারী-শিশুর মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ২৬ জনকে। দেশের ১৪টি জাতীয় দৈনিকের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই তথ্য তুলে ধরে মহিলা পরিষদ। কমিটির সভাপতি আয়েশা খানম জানান, গত বছর সারাদেশে ৯৪২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয় ৬৩ জন নারী ও শিশুকে। এই পরিসংখ্যান বলছে, শেষ ছয় মাসে শ্লীলতাহানীর শিকার হয়েছেন ৫৪ জন নারী, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১২৩ জনকে, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৭০ জন। এছাড়া এসিড সন্ত্রাস, যৌতুক, পাচার, শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা তো ঘটছেই। 
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতির সমাধান করা সবচেয়ে জরুরি। এজন্য আইনের যথাযথ সংশোধন ও প্রয়োগ হতে হবে। আমরা জানি, আইন প্রণয়ন একটি দীর্ঘ ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু যদি আমরা এটাকে জরুরি অবস্থা ধরি তাহলে কেন বিকল্প উপায়ে দ্রুত এই আইন সংশোধন করা যাচ্ছে না? এই পরিস্থিতি কি টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে যাচ্ছে?
১৪টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে করা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত আট বছরে ধর্ষণের শিকার ৪ হাজার ৩০৪ জনের মধ্যে ৭৪০ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, অধিকার, বিএনডব্লিউএলএ’র দেওয়া বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ সালে ধর্ষণের শিকার ৩০৭ জনের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ১১৪ জনকে। ২০০৯ সালে ধর্ষণের শিকার ৩৯৩ জনের মধ্যে ১৩০ জন, ২০১০ সালে ধর্ষণের শিকার ৫৯৩ জনের মধ্যে ৬৬ জন, ২০১১ সালে ধর্ষণের শিকার ৬৩৫ জনের মধ্যে ৯৬ জন, ২০১২ সালে ধর্ষণের শিকার ৫০৮ জনের মধ্যে ১০৬ জন, ২০১৩ সালে ধর্ষণের শিকার ৫১৬ জনের মধ্যে ৬৪ জন, ২০১৪ সালে ধর্ষণের শিকার ৫৪৪ জনের মধ্যে ৭৮ জন এবং ২০১৫ সালে ধর্ষণের শিকার ৮০৮ জনের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৮৫ জনকে। অর্থাৎ অনেক সোহাগীকে এই পৃথিবী ছাড়তে হয়েছে শুধু ধর্ষণের কারণে। ২০১৫ সালে মোট ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৮৪৬টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের ঘটনা ৪৮৪ টি, গণধর্ষণ ২৪৫, ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা ৬০, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ২ আর ধর্ষণচেষ্টা ৯৪ টি। ২০১৬ সালে ১০৫০ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০১৭ মোট ১ হাজার ২৫১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ২২৪ জন নারী ও শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৫৮ জনকে। গত বছর ধর্ষণসহ অন্যান্য নির্যাতনের মোট ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ২৩৫টি। ২০১৮ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে মোট ৯৪২টি। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার ১৮২ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৬৩ জনকে। এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় ১২৮ জনকে, শ্লীলতাহানির শিকার হয় ৭১ জন, যৌন নির্যাতনের শিকার ১৪৬ জন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) পরিসংখ্যান বলছে, (জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য) ২০০১ সাল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হন ১৮১ জন গৃহকর্মী। তাঁদের মধ্যে ধর্ষণের পর মোট কতজনকে হত্যা করা হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান দিতে না পারলেও সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত বছরেই ধর্ষণের শিকার ১১ জনের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় চারজন গৃহকর্মীকে।
এমন বাস্তবতায় বর্তমান জাতীয় পরিস্থিতি, অব্যাহত নারী-শিশু নির্যাতন, ক্রমবর্ধমান ধর্ষণ ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে মহিলা পরিষদ। একই সঙ্গে সরকারের কাছে কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে তারা।
এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- সকল ক্ষেত্রে পুত্র-কন্যার সমান অধিকার নিশ্চিত করা, সব ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, নারী নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক আশ্রয় দেয়া বন্ধ করা, বিচার কাজের সঙ্গে জড়িত সকলের প্রশিক্ষণ সূচিতে নারীর মানবাধিকার নিয়ে বিস্তারিত তথ্য যুক্ত করা।
ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুর বিব্রতকর পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে আয়েশা খানম বলেন, এখনো বাংলাদেশে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুকেই প্রমাণ করতে হয় যে, সে ধর্ষণের শিকার। অথচ বিশ্বের অনেক দেশে অভিযুক্তকে প্রমাণ করতে হয় যে সে ধর্ষণ করেনি। গত বছরের তুলনায় ধর্ষণের হার দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মহিলা পরিষদের সভাপতি বলেন, হঠাৎ ছয় মাসে এমন কী হলো যে, এত বেশি ঘটছে এ ঘটনা? মনস্তত্ত্বের কী এমন পরিবর্তন হলো সেটা তো গবেষণা করে দেখা দরকার। অপরাধবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত গবেষণা করা উচিত। 
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) পরিসংখ্যান বলছে, (জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য) ২০০১ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হন ১৮১ জন গৃহকর্মী। তাঁদের মধ্যে ধর্ষণের পর মোট কতজনকে হত্যা করা হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান দিতে না পারলেও সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত বছরেই ধর্ষণের শিকার ১১ জনের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় চারজন গৃহকর্মীকে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, দেশে যে হারে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা করার ঘটনা ঘটছে, তাতে আমি ভীষণ উদ্বিগ্ন ও দুঃখিত। তনু হত্যা আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের অবস্থান। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করছে, ধর্ষণের মতো ঘটনাকে সরকার কম গুরুত্ব দিচ্ছে।

 

মন্তব্য