বিশেষ খবর

ডেঙ্গু পরিস্থিতি

রোগী ২৫ হাজার, সুস্থ ১৭ হাজার

*২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৮৭০ 
*সংকটে ১২০ টাকার কিট ৪৫০ টাকা
*ডেঙ্গুতে প্রাণ হারালেন অতিরিক্ত আইজিপির স্ত্রী
*বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে ওষুধ আনার পরামর্শ

গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৮৭০ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে জানানো হয়েছে। এদিকে ডেঙ্গুর এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। ১২০ টাকার কিট কিনতে হচ্ছে ৪৫০ টাকায়। অন্যদিকে এডিস মশা নিধনে ওষুধের কার্যকারিতার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত আমদানি করার জন্য দুই সিটি করপোরেশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। 
এর আগে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল গত ১ অগাস্ট, সেদিন ভর্তি হয়েছিলেন ১৭১২ জন। এরপর দুদিন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমলেও রোববার আবার বেড়ে গেছে। এই ১৮৭০ জনের মধ্যে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে এক হাজার ৫৩ জন এবং দেশের আট বিভাগে ৮১৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৬৪৯ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তার মধ্যে রাজধানীতে ভর্তি হয়েছিলেন ৯৬৯ জন এবং বাকি জেলাগুলোতে ৬৮০ জন। 
তার আগে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত রাজধানীতে ৯৯৬ জনসহ পুরো দেশে এক হাজার ৬৮৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে। সরকারি হিসাবে, পুরো জুলাই মাসে সারাদেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ১৫ হাজার ৬৫০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন। আর, চলতি অগাস্ট মাসের প্রথম ৭২ ঘণ্টাতেই ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৬ হাজার ৯৬৭ জন। 
রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অর্ধ শতাধিক মৃত্যুর খবর ইতোমধ্যে এসেছে।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সকালে মারা গেছেন পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক শাহাবুদ্দীন কোরেশীর স্ত্রী ৫৪ বছর বয়সী সৈয়দা আক্তার। সারাদেশে বিভিন্ন হাসপাতালে এখনও ৭ হাজার ৩৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে রাজধানীর ৩৭টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৪ হাজার ৯৬৯ জন ভর্তি আছেন। চলতি বছরের প্রথম দিন থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গু নিয়ে ২৪ হাজার ৮০৪ জন বিভিন্ন হাসপাতালে গেলেও চিকিৎসা শেষে ১৭ হাজার ৩৮৮ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
রাজধানীর বাইরে ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এসব জেলার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ২১৬ জন, তাদের নিয়ে মোট চিকিৎসাধীন ৪৪৩ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন ডেঙ্গু রোগী ১৫৯ ও চিকিৎসাধীন ৪১৬ জন, খুলনা বিভাগে নতুন ১২৭ ও চিকিৎসাধীন ৪২১ জন, রাজশাহী বিভাগে নতুন রোগী ৮৩ জন ও চিকিৎসাধীন ৩৪২, বরিশাল বিভাগে নতুন ৭৮ জন ও চিকিৎসাধীন ২২৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে নতুন ৭০ জন ও চিকিৎসাধীন ২৬৮ জন, রংপুর বিভাগে নতুন ৫৩ জন ও ভর্তি ২১৫ জন এবং সিলেট বিভাগে নতুন শনাক্ত ৩১ জন ও হাসপাতালে ভর্তি ৯৯ জন।
সংকটে ১২০ টাকার কিট ৪৫০ টাকা: এদিকে ডেঙ্গুর এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জাহাঙ্গীর বলেছেন, আগে যে কিট আমরা ১২০ টাকা দিয়ে কিনতাম তা এখন ৪৫০ টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। রোববার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই আয়োজিত ‘দেশব্যাপী ডেঙ্গুর বিস্তার রোধকল্পে করণীয়’ শীর্ষ আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। 
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে পেনিক সৃষ্টি হয়েছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ ভালো হয়ে যায়। তবে এ বছর ডেঙ্গুর সব সিনড্রম ভয়াবহ। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসার জন্য ন্যূনতম এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। আমাদের দেশে কাজের বুয়া থেকে মেট্রিক পাসও ডাক্তার। দয়া করে চিকিৎসার জন্য নূন্যতম এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে যাবেন।
বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে ওষুধ আনুন: অন্যদিকে এডিস মশা নিধনে ওষুধের কার্যকারিতার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত আমদানি করার জন্য দুই সিটি করপোরেশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল রাজধানীর শান্তিনগরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আওয়ামী লীগের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানের অংশ হিসেবে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে এ আহ্বান জানান ওবায়দুল কাদের। এ সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘কার্যকর ওষুধের জন্য দুই সিটি করপোরেশন চেষ্টা করছে। আমরা আশা করছি, অনতিবিলম্বে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে ডেঙ্গু রোগের যে ভয়ংকর বিস্তার ঘটেছে, তা প্রতিরোধ করার জন্য ইমিডিয়েটলি যা যা করণীয়, আপনাদের করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবং জনগণকে এ বিষয়ে তথ্য দিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি শুধু অনুরোধ করব, দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আপনাদের একেকজন একেক কথা বললে বিভ্রান্তি ছড়াবে। আমি আপনাদের অনুরোধ করব, আপনারা যা বলবেন, একসঙ্গে বসে সমন্বিতভাবে ঠিক করে দেবেন যে, কোন দিন কী বক্তব্য, কী আপডেট আপনারা জনগণকে দেবেন। এমন কোনো বিষয় একেকজন বলবেন না, যাতে আজকে জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়, বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
সেতুমন্ত্রী আরো বলেন, যত দিন পর্যন্ত আমরা প্রাণঘাতী ডেঙ্গু থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারব না, ততদিন পর্যন্ত আমাদের এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ সময় লোক দেখানো পরিচ্ছন্নতা অভিযান না করে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানান ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, লোক দেখানো প্রোগ্রাম করবেন না। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান সফর করতে হবে। একটা মাইক লাগিয়ে কিছু লোক জড়ো করে পরীক্ষামূলক অনুষ্ঠান করে আমাদের দায়িত্ব শেষ করলে এডিস মশা দমন করা যাবে না। এ সময় গায়ে জ্বর থাকলে ঈদে বাড়ি যাওয়ার আগে রক্ত পরীক্ষা করার আহ্বান জানান সেতুমন্ত্রী। শোকের মাসে কোনো অপশক্তি যেন দেশে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটাতে না পারে, সে জন্য নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকারও আহ্বান জানান ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, এই শোকের মাসে আমরা ডেঙ্গু নিয়ে ব্যস্ত আছি। কিন্তু এই এডিস মশাদের চেয়েও বিপজ্জনক হচ্ছে এক অপশক্তি, অন্ধকারের শক্তি, এক কালো শক্তি। আগস্ট মাস এলেই এই অপশক্তির অশুভ তৎপরতা শুরু হয়। কাজেই ডেঙ্গুতে আমাদের ব্যস্ত রেখে এই অপশক্তি যাতে বাংলাদেশে কোনো রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি ঘটাতে না পারে, সে জন্য আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
এ সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. সাঈদ খোকন বলেন, সর্বশক্তি দিয়ে ডেঙ্গু মোকাবিলায় কাজ করছে সিটি করপোরেশন। সাঈদ খোকন বলেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে থাকবে ইনশাআল্লাহ।  এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সাংসদ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য মির্জা আজম, এস এম কামাল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ প্রমুখ।

 

মন্তব্য