বিশেষ খবর

সকালের সময় 'কোভিড-১৯' আপডেট
# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ 297,083 182,875 3,983
বিশ্ব 23,728,063 16,193,743 814,657

মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম (১)

ভেস্তে যাচ্ছে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’র প্রথম পদক্ষেপ

‘শিখন ও শিক্ষণ’ পদ্ধতির মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১০ সালে দেশের ২৩ হাজারেরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করে সরকার। বর্তমান সরকারের ঘোষিত রূপকল্প ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের অন্যতম একটি প্রকল্প এটি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, অদক্ষতার কারণে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার এই প্রথম পদক্ষেপটির বাস্তবায়ন সঠিকভাবে এগোচ্ছো না। শিক্ষার্থীদের গড় হাজিরাসহ ড্রপ আউটও ঠেকানো যাচ্ছে না। শিক্ষকরা বলছেন, পরীক্ষার ফলাফলেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে না। এ জন্যে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার গলদ এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতাকে দায়ি করছেন তারা। 
আর প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম পরিচালনায় নিয়োজিত শিক্ষকদের দক্ষতা ও যোগ্যতার অভাব রয়েছে। জানা গেছে, ২০১০ সালে প্রথম দফায় মাত্র ২৩ জন শিক্ষক নিয়ে ‘শিক্ষককেন্দ্রিক শিখন-শিক্ষণ’ পদ্ধতির বদলে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে দেশের সাতটি বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের কার্যক্রম শুরু হয়। পরের বছর ২০১১ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতরের মাধ্যমে ‘আইসিটি ফর এডুকেশন ইন সেকেন্ডারি এ্যান্ড হায়ার সেকেন্ডারি লেভেল’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। চার বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৩০৩ কোটি ৬৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকা।  তখন বলা হয়েছিল, প্রকল্পের আওতায় সারা দেশ থেকে ২০ হাজার ৫শ’টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় একটি করে কম্পিউটার ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম স্থাপন করা হবে। সে লক্ষ্যে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে একটি করে ল্যাপটপ, ইন্টারনেট মডেম, স্ক্রিনসহ মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর এবং সাউন্ড সিস্টেম।
২০১৫ সালের জুন মাসে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হলেও ৪ বছর পর প্রকল্পের সুফল নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ফলাফলের কোন উন্নতি না হওয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে শিক্ষকসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মাঝে। অভিযোগ রয়েছে, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম পরিচালনা তো দূরের কথা বেশিরভাগ ল্যাপটপ, ইন্টারনেট মডেম, মাল্টিমিডিয়া প্রোজেক্টর, প্রোজেক্টরের স্ক্রিন এবং সাউন্ড সিস্টেম এখন অব্দি অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। 
প্রকল্পের অবব্যহারের কারণ সম্পর্কে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, অবকাঠামোগত সমস্যা আছে। এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষকদের অনভিজ্ঞতা’। তিনি আরো জানান, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও সবগুলো ক্লাস পরিচালনায় তাঁরা দক্ষ হয়ে ওঠেনি। এছাড়া ডিজিটাল কনটেন্টেরও অভাব রয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রকল্প চলাকালে ২০১৪ সালে ইউএনডিপি পরিচালিত একটি স্টাডি রিপোর্টেও উঠে এসেছে এমন সব তথ্য। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে এমন ১০৮টি স্কুল, ১৬টি কলেজ এবং ৪৩টি মাদ্রাসাকে স্টাডির আওতায় নেওয়া হয়। বেইজলাইন স্টাডি অব মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- স্কুল শিক্ষকদের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষ, ৫ শতাংশ মাল্টিমিডিয়া প্রোজেক্টর পরিচালনায় দক্ষ, ৪ শতাংশ দক্ষ ইন্টারনেট ব্যবহারে, ১২ শতাংশ ই-মেইল ব্যবহারে দক্ষ এবং ১ শতাংশের দক্ষতা রয়েছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম পরিচালনা ও পাওয়ার পয়েন্ট তৈরিতে।
মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। সেখানে মাত্র ৩ শতাংশ শিক্ষক ইন্টারনেট ব্যবহারে দক্ষ, ৮ শতাংশ দক্ষ মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট তৈরিতে,  ১৯ শতাংশ দক্ষ ইউটিউব ব্যবহারে এবং ১১ শতাংশের দক্ষতা রয়েছে ই-মেইল এ্যাকাউন্ট খুলতে এবং ব্যবহার করতে।
কলেজের ক্ষেত্রেও হতাশাজনক চিত্র পাওয়া গেছে। মাত্র ৭ শতাংশ কলেজ শিক্ষকের দক্ষতা রয়েছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম পরিচালনায়, ইন্টারনেট ব্যবহারে এবং মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট তৈরিতে। ১৯ শতাংশ কলেজ শিক্ষকের ইউটিউব ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ইউএনডিপি’র ওই প্রতিবেদনে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের পাশাপাশি এর যন্ত্রপাতি ব্যবহার বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান খুবই জরুরি। পাশাপাশি এ পদ্ধতিতে পাঠদানের কন্টেন্ট বিষয়েও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথায় বড় বরাদ্দের প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ঠিকই হবে, তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত থেকে যাবে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ডিজিটাল কনটেন্টের এই দৈন্যতা দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সংশ্লিষ্ট এটুআই প্রকল্প থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পাঁচ হাজারেরও বেশি কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচিত সার্টিফাইড মাস্টার ট্র্রেইনারদের অধীনে সেরা শিক্ষকগণ প্রাথমিকভাবে ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণির ইংরেজি, বিজ্ঞান, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের ওপর মডেল কনটেন্ট তৈরি করছে। পরবর্তীতে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা, আইসিটি, ব্যবসায় শিক্ষা, কর্ম ও জীবনমুখি শিক্ষা, পদার্থ বিজ্ঞান, কৃষি শিক্ষা এবং ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়সমূহও মডেল কনটেন্ট তৈরির সাথে যুক্ত হবে। 

মন্তব্য