বিশেষ খবর

​এ কেমন উপাচার্য?

আল-আমিন: সম্প্রতি গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) শিক্ষার্থী সাংবাদিক ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে বহিস্কারের নোটিশ দেয়া হয়। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ১১ সেপ্টেম্বর এ নোটিশ দেয়া হয়।  বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্টার ড. মো: নূরউদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত নোটিশে বলা হয়, প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে আপত্তিকর লেখা লেখির কারণে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জিনিয়াকে বহিস্কারের নোটিশ দেয়া হল। 
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বশেমুরবিপ্রবির করণীয় নিয়ে নিজ ফেইসবুক একাউন্টে একটি মন্তব্যকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যাল প্রশাসন এই ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এসবের মধ্যেই  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ফাঁস হয় নোটিশপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সঙ্গে উপাচার্যের  কথাপোকথন। তা বিশ্লেষন করে জানা যায়, শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে অভিসিসূলভ, অশালীন মন্তব্য  করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টি উপাচার্য প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসির উদ্দীন।
সকালের সময়ের কাছে পৌঁছেছে উপাচার্য ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার কথাপোকথনটি। রেকর্ডিং-এ শোনা যায়, ছাত্রীর সাথে উপাচার্য প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসির উদ্দীন অপ্রীতিকর ভাষায় কথা বলছেন। এসময় শিক্ষার্থীকে তুই, তোকারি করেন উপাচার্য। যা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। 
”এটা কোন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের ভাষা হতে পারে না, একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয় তিনি (উপাচার্য) জানে না বলে মন্তব্য করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দীন। 
কথা বলার এক পর্যায়ে উপাচার্য শিক্ষার্থীকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কি তুমি জানো না? পোস্টে লেখছো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কি। উল্টা পাল্টা সব লেখছো, ব্যাপারটি কি? বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কি ফেসবুকে লেখার দরকার আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কি জানো না, ফাজিল কোথাকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ তোমাদের মত বেয়াদব তৈরী করা। আইছো তো ভদ্র হয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কি সেটা তোর আব্বার কাছ থেকে শুনিস। গেছে (পড়ছে) কোন দিন (তোর আব্বা)? আমি খুলছি বলেই তোর চান্স হইছে। না হলে তুই রাস্তা দিয়ে ঘুরে বেড়াতি। বেয়াদব মেয়ে! ৩ দিনের বাচ্ছুর তুই আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কি সেটা লিখিস। এ বিষয়ে বশেমুরবিপ্রবি ভিসির সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে সকালের সময়। তবে তিনি ফোন, এসএমএসের উত্তর না দেয়ায় এ ব্যাপারে তার মন্তব্য  নেয়া সম্ভব হয়নি। 
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া সকালের সময়কে বলেন, একজন উপাচার্যের কাছ থেকে এমন আচরণ কাম্য নয়। তিনি আমার সাথে ভিসিসুলভ আচরণ করেননি। তার কাছ থেকে আমি বেয়াদব ও ফাজিল শব্দ আশা করিনি। এতে আমি বিব্রত হয়েছি। তাই ভিসি পিতা হিসেবে যৌক্তিক প্রশ্নে আমার সাথে এমন আচরণ করতে পারেন না।
আমি ফেসবুকে শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়ে কোনো পোস্ট করিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেজ নষ্ট হয় এমন কোনো পোস্টও আমি দেইনি। আমি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ কী হওয়া উচিত এই পোস্টটি করেছি। এর বাইরেও যদি কোনো পোস্ট থেকে থাকে সেটি আমার নয়। ফেক আইডি থেকে করা হতে পারে। সেটা আমার দায়িত্ব না। এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে যেসব স্ট্যাটাস সরবরাহ করা হয়েছে সেসব আমার নয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. দিল আফরোজা বেগম সকালের সময়কে বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তিনি কোন অপরাধ করে থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 
উপাচার্য নাসির উদ্দীন স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দীন। তিনি সকালের সময়কে বলেন, একজন উপাচার্য কে সর্বোচ্চ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন ব্যক্তি যদি এ ধরনের ব্যবহার করেন তাহলে সেখান থেকে শিক্ষার্থী এবং জাতি কি আশা করতে পারে? 
এছাড়াও তিনি সকালের সময়কে আরো বলেন, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয় তখন সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের খোঁজ-খবর নেয়। এর আগেও তার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বিষয়গুলে কেন এতদিন আমলে নেওয়া হলো না এবং আমলে নিয়ে কেন তাকে অপসারণ করা হলো না সেটাই আমাদের প্রশ্ন। আমরা মনে করি সরকার বিষয়টি আমলে নিবেন এবং দ্রুত তাকে অপসারণ করবেন। 
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নূরুল হক নুর সকালের সময়কে বলেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে এ ধরণের আচরণ কাম্য নয়। তার বিরুদ্ধে এর আগেও অনেক ধরণের অভিযোগ রয়েছে। আমরা অবাক হচ্ছি কি ধরনের মানুষকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতিকরণের কারণে আজকের এই ধরনের বেহাল অবস্থা তৈরি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে তার যতটা না তার শিক্ষার যোগ্যতা বা জ্ঞান গরিমার উপর প্রাধান্য দেওয়া হয় তার চাইতে বরং রাজনৈতিক আনুগত্যকে বিবেচনা করা হয়। সুতরাং এখানে ভালো কিছু আশা করা খুবই দুরূহ হয়ে যায়। আর তার প্রমান হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাণ্ড। ঘটনাটি বেশ কিছুদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলেও এখন পর্যন্ত দেখলাম না ইউজিসি বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কোন ব্যবস্থা নিতে। এটা খুবই হতাশাজনক।
এদিকে ফাতেমা তুজ জিনিয়ার সাময়িক বহিষ্কার-আদেশ নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন সংবাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপাচার্য। উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিন মঙ্গলবার তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
উপাচার্য সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে। ওই সব পোর্টাল কোনো প্রকার তথ্য যাচাই না করে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে তথ্য না নিয়ে একতরফা সংবাদ পরিবেশন করছে।
জিনিয়ার বহিষ্কারাদেশ নিয়ে তিনি বলেন, জিনিয়া অন্যায়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে অশালীন, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছে। পাশাপাশি কুৎসা রটনা করেছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষিকাদের ফেসবুক, ইমেইল আইডি হ্যাক করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ওয়েবসাইট হ্যাক করে ভর্তি পরীক্ষা বাতিলের ষড়যন্ত্র করেছে।
উপাচার্য সংবাদ সম্মেলনে অন্য এক শিক্ষার্থী ও ‘জিনিয়ার’ ফেইসবুক ম্যাসেঞ্জারের কথোপকথনের স্ক্রিনশট তুলে ধরেন। সেখানে জিনিয়া কয়েকজনের ফেইসবুক আইডি হ্যাক করার কথা প্রকাশ করেন বলে উপাচার্যের দাবি।
জিনিয়াকে সরকারবিরোধী সংগঠনের নেতা দাবি করে তিনি বলেন, সে সরকারবিরোধী সংগঠনের নেতা ও বিভিন্ন বিতর্কিত ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ রেখে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
জিনিয়া বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নিয়ে মিথ্যাচার ও অশালীন মন্তব্য করেছে। অথচ বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণের কোনো টাকা এখনও খরচ হয়নি। শিক্ষকদের অপমান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা একজন শিক্ষার্থী হিসাবে অন্যায়, গর্হিত ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
তিনি তার কক্ষে জিনিয়াকে ‘তলব’ করেছিলেন জানিয়ে বলেন, এসব বিষয় নিয়ে জিনিয়াকে আমার কক্ষে তলব করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে উল্টোপাল্টা কথা বলে। কথা প্রসঙ্গে আমি তাকে সন্তান হিসেবে দাবি করে বেয়াদব ও ফাজিল শব্দ উচ্চারণ করি।
জিনিয়া অনুমতি না নিয়ে আমার ও তার মধ্যকার কথা গোপনে মোবাইল ফোনে রেকর্ড করে। এ ভয়েস রেকর্ড সে ইউটিউব, ফেসবুকে প্রচার করেছে। অনেক নিউজ পোর্টাল জিনিয়াকে ভিসি গালমন্দ করেছে বলে নিউজ প্রচার হচ্ছে। তিনি জিনিয়াকে গালমন্দ করেননি বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন।

 

মন্তব্য