জাতীয়

শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ী ফেরী ও নৌ-রুট

নাব্যতা সংকটের সমাধান

বাংলাদেশের প্রধান নদ-নদীদের মধ্যে পদ্মা উগ্রউত্তালে বিচিত্র চরিত্রের একটি নদী, এই নদীর চরিত্র বুঝতে বাঘা বাঘা বিশেষজ্ঞ হিমসিম খেয়ে থাকেন। এই নদী তার প্রবাহ পথে ব্যাপক ভাঙনের মাধ্যমে প্রচুর পলি নিজ স্রোতে বহন করে থাকে। মাদারীপুর ও মুন্সিগঞ্জের এলাকার মাঝ দিয়ে বয়ে চলা পদ্মার ফলে নদীর তলদেশে বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপকভাবে পলি জমে নাব্যতা সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ী ফেরী ও নৌ-রুটে এই নাব্যতা সংকট তীব্রতর। প্রায় সময় নৌযানগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ি ফেরীরুটে প্রায় ১৬ লাখ ঘন মি: মাটি-বালু অপসারণ করা হয়েছে এবং বিআইডব্লিউটিএ’র ৯টি ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের ৪টি অর্থাৎ মোট ১৩টি ড্রেজার ওই রুটের বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজিং কাজে নিয়োজিত রয়েছে। পর্যাপ্ত ড্রেজিং ইউনিট এখানে পলি অপসারণে সব সময় নিয়োজিত থাকার পরেও নাব্যতা সংকট নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন কর্মকর্তারা। একটি জায়গায় ২০ ফুট পানি নিশ্চিত হওয়ার পর কয়েক ঘন্টা পরে সেখানে ৫ফুট পানি দেখা যায়, ২০১৪ সালের ৬আগস্ট মাদারীপুর ও মুন্সিগঞ্জের এলাকার মাঝ দিয়ে বয়ে চলা পদ্মায় পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চের ডুবি হয়, তখন সেখানে ৬০ফুট গভীর পর্যন্ত পানি ও নদী উত্তাল থাকায় উদ্ধার কাজ ব্যহত হয়। কিন্তু এর পরের দিনই ওই জায়গায় মাত্র ৩ফুট গভীর পানি দেখা যায়। শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ী ফেরী-রুট দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ অক্ষুন্ন রাখার জন্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ন ও স্পর্শকাতর ফেরী-রুট। কোন কারণে এ ফেরী-রুটে নৌ-চলাচল ব্যহত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগে বির্পযয়ের সৃষ্টি হয়। প্রতি বছর বর্ষা মৌসূমে উজান হতে আসা বিপুল পরিমান পলি এ ফেরী-রুটের বিভিন্ন স্থানে জমা হওয়ায় নাব্যতা ব্যপক হারে হ্রাস পেয়ে ফেরী ও নৌ-চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। বিআইডব্লিউটি’এ গুরুত্বপূর্ণ এই ফেরী ও নৌ-রুটের নাব্যতা রক্ষায় প্রতি বছর সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং কাজ পরিচালনা করে থাকে। বর্ষা মৌসূমে এ ফেরী-রুটের মূল পদ্মা নদীর সাথে সংযুক্ত লৌহজং টার্নিং পয়েন্ট এলাকায় নাব্যতা সমস্যাযুক্ত স্থান সমূহে জুলাই - সেপ্টেম্বর মাসে প্রবল স্রোত ৭-৮ ‘নোট’ থাকে এবং এখানে ঘুর্ণবার্তার সৃষ্টি হয়। প্রবল স্রোতের কারণে এ সময়ে ফেরীগুলোর চলাচল বাধাগ্রস্থ হয় এবং  বিআইডব্লিউটিএ’র নিজস্ব ড্রেজার (১৮-২৬ ইঞ্চি সাই) তথা বাংলাদেশী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের ড্রেজারগুলো (১৮-২০ ইঞ্চি সাইজ) স্থাপন করা সম্ভব হয় না। স্রোতে ড্রেজারগুলো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। উজান হতে অব্যহতভাবে আসা পলি দ্বারা নৌ-চ্যানেল ভরাট হতে থাকায় এবং প্রবল স্রোতের কারণে লৌহজং টানিং পয়েন্ট দিয়ে ফেরী চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তবে বিআইডব্লিউটিএ’র অক্লান্ত পরিশ্রম করে কোন রকমে শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ী ফেরীরুট পরিচালনা করছে। এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটি’র চেয়ারম্যান কমোডর এম মাহবুবুল ইসলাম বলেন, শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ি নৌরুট খুবই গুরুত্বপূর্ণ এখান থেকে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার যোগাযোগ চালু রাখতে আমাদের ড্রেজিং বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। এই রুট এখন চালু আছে। কোনো রকম অসুবিধা নেই, সবধরনের নৌযান চলাচল করছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র গৃহীত কার্যক্রম : বিরুপ পরিস্থিতিতে শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ী ফেরী-রুটে ফেরী ও নৌ-চলাচল নির্বিঘ্নে পরিচালনায় বিআইডব্লিউটি কর্তৃপক্ষ প্রতি বছরের ন্যয় পূর্বের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ী সোজা চ্যানেল হতে প্রায় ১.৫০ কিমি. ভাটিতে উচু চরের মধ্য দিয়ে গত ২৩মার্চ হতে পর্যাক্রমে কর্তৃপক্ষের ৯টি ড্রেজার ও বেসরকারী ৩টি ড্রেজার নিয়োগ করে দিনরাত ২৪ ঘন্টা নিরলস পরিশ্রমে চেষ্টা করে ৮০ মি. প্রসস্থের ১.৮০ কিমি দৈর্ঘ্যরে ৪.০০ মিটার গভীরতা রেখে বাইপাস চ্যানেল গত ১আগস্ট ফেরি ও নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ওই চ্যানেল দিয়ে ফেরি ও নৌযান চলাচল অব্যহত থাকা অবস্থায় গত ৩০সেপ্টেম্বর থেকে নদীর পানি ক্রমান্বয়ে প্রায় ১.৫০ মিটার বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ী পুরাতন সোজা চ্যানেলের মাটি বালু ওয়াস হয়ে লৌহজং টার্নিং পয়েন্ট দিয়ে বিকল্প চ্যানেলের মুখসহ মাগুরখন্দ এলাকায় জমেছিল এবং প্রবল স্রোতের কারণে বিকল্প চ্যানেলের দুই পাড় ভেঙ্গে বালু মাটি জমে চ্যানেলের নাব্যতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এর আগে ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে বিকল্প চ্যানেল দিয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সোজাসুজি চ্যানেলে পানি ৮-৯ ফুট থাকায় এ চ্যানেল ব্যবহার করে ফেরী চলাচল করেছে। সোজাসুজি চ্যানেলটি পুনরায় পলি জমে ভরাট হওয়ায় ২৯সেপ্টেম্বর বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প চ্যানেলে ৬টি ড্রেজার নিয়োজিত করে ২৪সেপ্টেম্বর হতে ২৯সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ড্রেজিং-এর মাধ্যমে ২৪০ ফুট প্রশস্থ এবং ১৪-২০ ফুট পানির গভীরতা রেখে ২৯সেপ্টেম্বর পুনরায় ফেরী চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ২৯সেপ্টেম্বর হতে ১৪অক্টেবর পর্যন্ত বিকল্প চ্যানেল ব্যবহার করে ফেরী চলাচল করেছে। উজানে ভারতের উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন স্থানে বন্যা ও প্রচুর পরিমানে বৃষ্টি হওয়ায় ফারাক্কা ব্যারেজের সবকয়টি গেট খুলে দেয়ায় পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল, স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং উজানে ব্যাপক ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছে। ফলে উজান হতে স্রোতের সাথে পলি এসে লৌহজং টার্নিং পয়েন্ট, বিকল্প চ্যানেল ও ফেরীরুটে দ্রুত ভরাট হয়েছে। এ প্রায় ২ কিমি প্রশস্থ ও ৫ কিমি দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট একটি ডব চরের সৃষ্টি হয়েছে। নাব্যতা সংকটে ৩ দিন ফেরী চলাচল বন্ধ ছিল। স্রোতের বেগ ৭ “নোট” এর উপরে হওয়ায় ড্রেজার স্থাপন করা কষ্টসাধ্য হয়ে গিয়েছিল, ড্রেজার স্থাপনে প্রায় ৩ দিন লেগেছিল। ড্রেজার স্থাপন করা হলেও ড্রেজার সুইং দিয়ে কাটতে সক্ষম হয়নি, ড্রেজারের ফ্লোটিং পাইপ ভেঙ্গে যাচ্ছিল। অন্যদিকে অন্যদিকে অনবরত পলি এসে জমা হচ্ছিল। প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে সোজাসুজি চ্যানেলে ৩টি ২৬ ইঞ্চি কাটার সাকশন ড্রেজার ও ২ টি ২০ ইঞ্চি কাটার সাকশন মোট ৫টি ড্রেজার লৌহজং টার্নিং পয়েন্টে ২৪ ঘন্টা অনবরত ড্রেজিং করার পর গত ১৮অক্টোবর হতে ফেরী চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। বর্তমানে ওই চ্যানেলে ১০-১১ ফুট গভীরতায় পানি রয়েছে এবং সবগুলো ফেরী নির্বিঘ্নে চলাচল করছে।
শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ী নৌ-পথের বর্তমান অবস্থা : উক্ত এলাকায় বর্তমানে সর্বনিম্ন ১০-১১ ফুট গভীরতায় পানি রয়েছে। নাব্যতা সংকট এলাকায় বিআইডব্লিউটিএ’র ও বেসরকারী ড্রেজার দ্বারা ড্রেজিং কাজ অব্যহত রয়েছে। উল্লেখ্য বিশেষ করে লৌহজং টানিং পয়েন্ট, শিমুলিয়া, মাগুরখন্দ ও হাজরা পয়েন্টে পলি মাটি জমছে যা অপসরণের লক্ষ্যে ১৩টি ড্রেজার ২৪.০০ ঘন্টা নিরলস ড্রেজিং কাজ করছে। বর্তমানে পুরাতন সোজা চ্যানেলে প্রয়োজনীয় নাব্যতা থাকায় ফেরি চলাচলের কোন সমস্যা নেই। তবে পানি স্রোত বৃদ্ধি পাওয়ায় ড্রেজিং কার্যক্রম এবং ফেরী চলাচল ব্যহত হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী ১০-১২ দিনের মধ্যে ওই ফেরী রুটের ড্রেজিং কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে। 

মন্তব্য