সাহিত্য

ডু ইউ রিমেম্বার মি?

মার্ক আর আমার বিয়ের পর পরই হঠাৎ করেই মাইক ঘোষণা করেছিল সে আর তার নতুন গার্লফ্রেন্ড সুজানা বিয়ে করতে যাচ্ছে। আমরা আনন্দে হৈহৈ করে উঠলাম। সুজানা গায়েনিজ মেয়ে। মাইকের মতই তারাও খ্রীষ্ঠান ধর্মাবলম্বী। তাই পুরোপুরি খ্রীষ্টান ধর্মীয় আবহেই তাদের বিয়ে হল। কিন্তু তা সত্তেও তাদের বিয়েতেও একটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি হয়েছিল। সুজানার পূর্ব পুরুষ ছিল ভারতীয়। তাদের খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে, আনন্দ উৎসব, ঘরোয়া ভাষা এখনো সেই ভারতীয় আমেজটিকে ধরে রেখেছে। তাই তাদের বিয়েতে ভারতীয় এবং গায়েনিজ আমেরিকান দুটো সুরই প্রধান ভূমিকা নিল। নাচ, গান হলো মিশ্ররীতিতে। ভারতীয় গান আর নাচের পাশাপাশি পশ্চিমা নাচ, গানও ডান্সফ্লোর মাতালো। খাবার পরিবেশনেও এলো বৈচিত্র। দেশি এবং বিদেশি দুই ধরনের খাবার অতিথিদের রসনাকে তৃপ্ত করেছিল। বিয়ের পর মাইক আর সুজানা দম্পতি হানিমুন করতে গেল হাওয়াই দ্বীপে। ঘুরে বেড়ানোতেই মাইকের আনন্দ। তাই বছরের প্রায় সময়টাতেই যখনই কোন ছুটিছাটা থাকে, ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে মাইক ভ্রমনে বেড়িয়ে পড়ে। সুজানাকেও তাই তার পায়ে খরম পড়ে রেডি থাকতে হয়। আমাদের সঙ্গে মাইকের খুব কমই দেখা হয়। বহু দিন পর একদিন হঠাৎ উদয় হয়ে আমাদের চমকে দেয় মাইক আর সুজানা দম্পতি। একসময় তার দুজন এসে হাজির হতো। তারপর একসময় এলো তিন জন মিলে। সুজানার কোলে তাদের মেয়ে। বছর ঘুরতেই তিনজন ফিরে এলো চারজন হয়ে। মাইকের কাঁধে তার কন্যা। সুজানার কোলে শিশুপুত্র। এই ছিল আমাদের মাইকের চমকে দেয়ার রীতি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সকাল। সেদিনের সকালটিও ছিল অন্যসব দিনের মতই। সূর্য উঠেছিল সময় মত। আবহাওয়া ছিল চমৎকার। লোকজন বেরিয়ে গিয়েছিল যার যার কাজে। মানুষ ধীরে ধীরে কর্মস্থলের দিকে যাচ্ছিল।”ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে।” সেই রূপকথার গল্পের মতই ভোর হতে না’হতেই বর্গীর আক্রমণ শুরু হল নিউইয়র্কে। রাত জাগা ক্লান্ত নিউইয়র্ক, ঘুমঘুম সকাল, কেউ হয়তো কেবলই গরম কফি হাতে কাজে ছুটছে, কেউ সবে অফিসের ফাইল খুলে বসেছে, বাচ্চারা স্কুলে, কেউ সদ্য ঘুমভাঙা চোখে বেলকনিতে দাড়িয়ে আকাশ দেখছে, তখনই বর্গীর আক্রমণ হল। আজ থেকে আঠারো বছর আগের সেই সকালের স্মৃতি আমার এখনো পরিস্কার মনে পড়ে। আমি ছিলাম রান্নাঘরে। মার্ক সকালের ব্রেকফাস্ট শেষ করে সবে ঘর থেকে বেড়িয়েছিল। সে আবার দৌড়ে ঘরে ফিরে এলো। ফিরে এসে টিভিতে সিএনএন খুলে  চিৎকার করে বারবার আমার নাম ধরে ডাকতে লাগল। বললো, ‘মিলি, সামথিং রং, সামথিং রিয়েলি রং। আই ডোন্ট নো হোয়াট হ্যাপেন্ড। বাট ইটস্ রিয়েলি ব্যাড।’ আমি তাড়াতাড়ি লিভিং রুমের দিকে দৌড়ে এলাম। মার্ক তখন সিএনএনের খবর দেখতে শুরু করেছে। হঠাৎ করেই যেন দৃশ্যপট বদলে গেল। চারিদিকে তৈরি হল এক ত্রাসের রাজত্ব। আমি আর মার্ক হতভম্বের মত টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকিয়ে আছি। আমাদের মাথায় কিছুই ঠুকছিল না। জানা গেল সকাল ৮:৪৫ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৬৭ বিমানটি প্রায় বিশ হাজার গ্যালন জেট ফুয়েল নিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে আঘাত করেছে। এটি ছিল ১১০ তলা ভবন যার ৮০তম তলায় বিমানটি আঘাত করে। মুহূর্তের মধ্যে কয়েকশ মানুষ মারা গেছে। আমার কণ্ঠরোধ হয়ে এলো। বিরবির করে বললাম, ‘অসম্ভব! অসম্ভব ব্যাপার! এটা হতেই পারে না’। আমার মাথা ঘুরতে লাগল। মনে হল আমি পড়ে যাচ্ছি। আমি মার্কের পাশেই ধুপ করে বসে পড়লাম। কী অসম্ভব ঘটনা ঘটে গেছে। আমি নিজের চোখে এ কী দৃশ্য দেখলাম। বিরাট এক্সিডেন্ট। পর পর দুটো প্লেনই টুইন টাওয়ারের ভেতরে ঢুকে গেল। দুই বিল্ডিংয়েই আগুন ধরে গেছে। বোঝা গেল না দুটো প্লেনই কিভাবে এমন পর পর এক্সিডেন্ট করল। আমাদের ধরণা হল, প্লেন দুটো হয়তো ভুলবশত টাইমের আগে নিচে নেমে গিয়েছিল। তাই টাওয়ারে ধাক্কা খেয়ে বিল্ডিংযের ভেতরে ঢুকে গেছে। টিভিতে দেখছিলাম, মানুষজনের ছোটাছুটি, ধোঁয়ায় চারদিক অন্ধকার। আকাশে ছাই উড়ে যাচ্ছে। আমার চুলো অফ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। মাংস পোড়া গন্ধে দৌড়ে রান্না ঘরে গেলাম। চুলো অফ করে দিয়ে আবার ফিরে এলাম টিভির সামনে। টিভি পর্দায় চোখ রেখে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। ততক্ষণ খবর বের হতে শুরু হয়েছে। একই সময়ে ওয়াশিংটন ডিসিতেও একই ঘটনা ঘটেছে। পেন্টাগন হাউজেও প্লেন হামলা হয়েছে। আমার কাছে সব কিছুই কেমন যেন অবিশ্বাস্য, হেলুসিনেশনের মত ব্যাপার মনে হতে লাগল। মনে হলো হয়তো পরে জানা যাবে এটা কোন দুধর্ষ সিনেমার শুটিং চলছিল। একসময় মার্ক আর আমার যেন হুস ফিরে এলো। আমাদের মনে পড়লো আবিদ আর মাইকের কথা। ওদের দুজনেরই অফিস নর্থ টাওয়ারের বিশ তালায়। ওদের কি খবর কে জানে। আমার হাতপা থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। বহু দিন পর যেন  কায়মনে আল্লাহ’কে ডাকতে শুরু করলাম। ‘আল্লাহ, আমাকে আর কোন বড় আঘাত তুমি দিও না আল্লাহ। আমি আর নিতে পারবো না। তুমি আমার আবিদকে কেড়ে নিও না। মাইক’কে কেড়ে নিও না। প্লিজ, প্লিজ!’ আমি কাঁপতে কাঁপতে আবিদের নাম্বারে ফোন করলাম। তিন চার বার রিং হতে হতেই লাইন কেটে গেল। ততক্ষণে আমার মাথা ঘুরে চোখ অন্ধকার হয়ে আসছিল। আমার মন বললো, ‘হয়তো আবিদ আর নেই’! কতক্ষণ অচেতন হয়েছিলাম জানিনা। চোখেমুখে ঠান্ডা পানির স্পর্শে আমার জ্ঞান ফিরে এলো। মার্কের উদগ্রীব মুখ দেখে কষ্ট হলো, বেচারিকে ভড়কে দিয়েছিলাম বলে। আমার জ্ঞান ফিরে আসার সঙ্গে সাথেই মার্ক আবার আবিদ’কে ফোন করল। এবার সে ফোন রিসিভ করল। জানালো সে অনেক আগেই বেড়িয়েছিল। কিন্তু অফিসে ঢোকার আগ মূহুর্তেই পুরনো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ায় সে ওয়াল স্ট্রিটে  দাঁড়িয়ে বন্ধুর সঙ্গে কফি খেতে খেতে গল্প করছিল। এবং হঠাৎ করে তার চোখের সামনেই দেখলো টাওয়ার দুটো কিভাবে খসে পড়ে যাচ্ছে। সে এখন লোয়ার ম্যানহাটনে আটকা পড়ে গেছে। রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে গেছে। কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। তার সারা শরীর ধোঁয়া আর ছাইয়ে মাখামাখি হয়ে আছে। সে জানালো, এই সময় ডাউন টাউনে না আসাই ভাল। পুলিশ ব্যারিক্যাড দিয়ে অনেক রাস্তাই আটকে দিচ্ছে। ফোন রাখতে গিয়ে খানিকটা ইতস্তত করে সে বললো, ‘মিলি, মাইকের কোন খোঁজ এখনো পাইনি। তবে সে সম্ভবত ভিতরেই ছিল। ভালো কথা বাবা আর পলির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তুমি ভেবো না। পরিস্তিতি ঠিক হলেই আমি বাড়ি ফিরে আসবো। এসে তোমাদের সঙ্গে দেখা করবো। আমরা তাড়াতাড়ি সুজানাকে ফোন করলাম। সুজানার তখন পাগলের মত অবস্থা। সে অনবরত কাঁদছিল। তার কথা বলার মত শক্তিটুকুও ছিলনা। সে শুধু বলতে পারলো মাইক বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে বেশ আগেই। এসময় তার অফিসেই থাকার কথা। আমি আর মার্ক পাগলের মত, উদভ্রান্তের মত পরিচিত একেক জনকে ফোন করে খুঁজতে শুরু করলাম। পরে জেনেছিলাম, তখন টুইন টাওয়ারের সঙ্গে তাদেরও সমাধি হচ্ছিল। তাদের অনেকেই আর ফিরে আসতে পারেনি। এক নিমিষেই টুইন টাওয়ারে কর্মরত হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ মারা গেল। হাজার হাজার মানুষের পদচারনায় একদা মুখর টুইন টাওয়ার আগুনে জ্বলতে জ্বলতে, আগুনের তাপে গলতে গলতে এর ভেতরে থাকা মানুষগুলোকে নিয়েই মাটির সঙ্গে মিশে গেল। কত হাজার হাজার মানুষের শ্রম, কোটি কোটি ডলার ব্যয়, কী বিশাল বিস্তৃতি, কত হাজার হাজার মানুষের রুটিরুজির উৎস ‘টুইন টাওয়ার’ হারিয়ে গেল চিরতরে। চিরতরে হারিয়ে গেল কত শত স্বপ্ন। কত শত স্বপ্নবাজ মানুষ। আর তাদের কখনো দেখিনি। হারিয়ে গেল জমজ দুই ভাই। কিন্তু সেদিনও নিউইয়র্কের মানুষেরা এক হয়ে গিয়েছিল। কেউ মনে রাখেনি, তারা কে, কোথা থেকে এসেছে। নিউইয়র্কাররা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে কাজ করেছে। সবাই একসাথে কেঁদেছে। সবার চোখের জল ছিল একই রঙ্গের। সবার বেদনা ছিল বুক ভাঙ্গা। ওরা জীবন দিয়েছিল। কেউ খৃষ্টান, কেউ মুসলিম, কেউ ইহুদি, কেউ হিন্দু, কেউ বৌদ্ধ। তারা সবাই এসেছিল পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে। কিন্তু তারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিল নিউইয়র্কার পরিচয়ে। তাদের গায়ের রং ছিল সাদা, কালো, বাদামি, হলুদ। কিন্তু তাদের সবার রক্তের রং ছিল টুকটুকে লাল। তারা, আমরা সবাই মিলে একটু একটু করে, রঙিন করে, সুন্দর করে গড়ে তুলেছিলাম আমাদের ভালবাসার, আমাদের প্রাণের নিউইয়র্ক। মাইকের কোন খবর পাওয়া গেল না। টুইনটাওয়ারের সঙ্গে মাইকও হারিয়ে গেল আমাদের জীবন থেকে। সুজানা আর তাদের দুটি সন্তানের সঙ্গে সে তার শেষ কথাটি বলারও সুযোগ পায়নি। সেদিনের সেই অভাবনীয় ঘটনায় সারা পৃথিবীর মানুষ শোকে স্তব্ধ হয়ে গেল। হতবিহবল হয়ে গেল। কত শত পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেল। কত স্ত্রী বিধবা হল, কত শিশু পিতৃমাতৃহীণ হল। প্রেমিক হারালো তার প্রেমিকাকে। আমরা মুসলিমরা হারালাম মানুষের বিশ্বাস আর শ্রদ্ধা। আজ ২০১৯ এ এসে এত বছর বাদেও পুরনো সেই ওয়েস্ট ভিলেজের দিনগুলোতে আমি মাঝেমাঝেই ফিরে যাই। মনে পড়ে, পলের কথা। মনে পড়ে মাইকের কথা। সেই মাইক। বিশাল হাসি আর ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো যার কালো রং মুখটিকে উদ্ভাসিত করে তুলতো। হঠাৎ হঠাৎ গায়েব হয়ে যাওয়া থেকে ফিরে এসে যে চমকে দিতো। সে এমনি হঠাৎ করেই একদিন হারিয়ে গেল। কিন্তু চমকে দেবার জন্য আর কখনো ফিরে এলোনা। আর কখনো আসবেনা। সেই নাইন ইলেভেন। ২০০১ সাল। টুইন টাওয়ার আর অনেকগুলো তাজা প্রাণের সঙ্গে আমাদের মাইকও হারিয়ে গেল চিরতরে। মাঝে মাঝে নতুন গড়ে ওঠা ‘ওয়াল্ড ট্রেড সেন্টার’এ যাই। মানুষগুলো হারিয়ে গেছে। কালো গ্রানাইট পাথরের উপর লেখা তাদের নামগুলো ছুঁয়েছুঁয়ে দেখি। “মাইকেল জর্জ ওয়াশিংটন” নামটির উপর হাত দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। মনে হয় হাতের নিচে পাথরে খোদাই করা নামটি যেন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। বলছে, ‘মিলি, ডু ইউ রিমেম্বার মি?’ আমি ফিসফিস করে বলি, ‘অফকোর্স আই রিমেম্বার ইউ। আই অলওয়েজ ডু!’

মন্তব্য