সাহিত্য

ঘাতকের সাথে বসবাস

আজকাল আমার পাপা সব কিছুতেই ভিষন অবাক হয়ে যান। বলেন, “কী অবাক বিশ্বে বাস করছিরে মা! আমাদের সময়তো এমন ছিল না? আমাদের সময় সবকিছুই খুব অন্যরকম ছিল। বেশীরভাগ কাজ মানুষ নিজের হাতে করতো। আজকাল দেখছি মানুষের কাজগুলো সবই হাইজ্যাক হয়ে যাচ্ছে। সব কাজই দখল করে নিয়েছে কম্পিউটার।” পাপা আসলে ঠিকই বলেন। সত্যিই তাই হয়েছে।  রবোমানুষদের উন্নতি ও বিকাশের কারনে অনেক চাকরিইতো ইতোমধ্যেই মানুষের হাতছাড়া হয়ে গেছে। সেই ২০১৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যেইতো বিশ্বের প্রায় ৮০ কোটি চাকরি চলে গিয়েছিল রোবটদের হাতে।পাপার ভাগ্য ভাল বলতে হবে। তার ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ পদটি দখল হয়ে যাবার আগেই সে তার কাজে অবসর গ্রহণ করেছিলেন।  পাপা’র অবসর গ্রহণের বেশ আগেই আমার মাম মারা গেলেন। সেটা ২০২০ সালের কথা। তাই কাজে অবসর গ্রহণের পর পর পাপা’র নিঃসঙ্গ দিনগুলো পাথরের মতই ভারী হয়ে ওঠেছিল। আমার নিজের তখন নিউরোসাইন্সের মত জটিল বিষয় নিয়ে পিএইচডির শেষবর্ষের পড়াশোনার চাপ। প্রচন্ড ব্যাস্ততম সময় যাচ্ছিল।ইচ্ছে থাকা স্বত্বেও পাপা’র জন্য সময় বের করা আমার জন্য কঠিন ছিল। তারপর পিএইচডি শেষ করে চলে যেতে হল জনস হপকিন্স এ পোস্ট ডক্টরাল প্রোগ্রামে। তাই পাপা’কে একটা লম্বা সময় কঠিন নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে হচ্ছিল।যদিও পাপা সম্পর্কে লীনা খালামনি ও আরও অনেকের অনেক বাজে সমালোচনা মাঝেমধ্যেই আমার কানে আসতো। কিন্তু এসব শোনার মত সময়, ধৈর্য এবং মানসিকতা কোনটাই আমার ছিল না। এখনও নেই। কারন পাপাকে আমি অনেক ভালোবাসি। এই মানুষটা তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনে যে কারও সাথেই মানসিক এবং শারীরিক সম্পর্কে জড়ানোর অধিকার রাখে। একজন মানুষ তার একজীবনে সুখী হবার সমস্ত অধিকারই সংরক্ষণ করে বলে আমার বিশ্বাস। সেই ২০১৪ থেকেই আমাদের বাড়িতে আ্যামাজনের আবিস্কার আ্যালেক্সার আগমণ ঘটেছিল।তখন আ্যালেক্সার আকৃতি ছিল একটি গোল চাকতির মত। আমাদের বসার ঘরের এক কোনের একটি কর্ণার টেবিলে ছিল আ্যালেক্সার অবস্থান। “আ্যালেক্সা” নাম ধরে ডাকলেই সে সচকিত হয়ে জেগে উঠতো। গোল চাকতির চারদিকে ঘুরানো ফিতের মত বর্ডারে নীল রঙের আলো জ্বলে উঠতো আ্যালেক্সার শরীরে। প্রতিবারই নাম ধরে ডেকে জিজ্ঞেস করতে হোত,  “আ্যালেক্সা, হোয়াট টাইম ইজ ইট?” “আ্যালেক্সা হাউ ইজ ওয়েদার আউটসাইড নাও?” “আ্যালেক্সা প্লে রড স্টুয়ার্ডস ‘শেলী মাই লাভ’ সঙ”। আ্যলেক্সা প্রায় নির্ভুলভাবেই সব প্রশ্নের উত্তর দিত। সব কাজ করে দিত। আমার বন্ধুরা বাসায় এলে আমরা আ্যলেক্সাকে নিয়ে অনেক ফান করতাম। নানারকম অদ্ভুত প্রশ্ন করে আ্যালেক্সাকে ভড়কে দিয়ে আমরা মজা পেতাম। ওর কম্পিউটার ব্রেন তখন জ্যাম হয়ে যেত। উল্টাপাল্টা উত্তর দিতে শুরু করত আ্যালেক্সা। তখন আবার নতুন করে ওকে রিসেট করতে হত। স্মার্টফোনের পরপরই বাজারে এসেছিল স্মার্টওয়াচ। তখনতো জীবন আরও সহজ হয়ে গেল। আমার এখনও পরিস্কার মনে পড়ে, পাপা’র এক জন্মদিনে আমি তাঁকে উপহার দিয়েছিলাম একটি  স্মার্টওয়াচ। সেই অবাক করা ঘড়ি পাপা সকাল বিকাল কয় কদম হাঁটছেন তার হিসেব বলে দিতে লাগলো। তাতে কত ক্যালোরী তিনি বার্ণ করেছেন, তাঁর হার্টরেট কত, প্রেসার কত সবই থাকত ঘড়ি’র নখদর্পনে। আ্যালার্ম বাজিয়ে শাওয়ার নেয়ার সময়, ওষুধ খাওয়ার সময় মনে করিয়ে দিত ঘড়ি। সকল কাজের কাজী এই ঘড়ির কাজের বহরে মুগ্ধ হয়ে মাম’কেও একখানা স্মার্টওয়াচ কিনে দেয়া হল।শেষপর্যন্ত সেই স্মার্টওয়াচই মাম এর শেষ সময়ে বন্ধুর কাজ করেছিল। হঠাৎ একদিন পা ফসকে তাল হারিয়ে আমার মা দোতলার সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে নীচে পড়ে গেলেন। অজ্ঞান রক্তাক্ত মাম’কে তাঁর হাতঘড়িই ৯১১ এ কল করে হাসপাতালে পৌঁছানোর ব্যাবস্থা করে দিয়েছিল।  মাম’কে কবর দেয়া হল ব্রুকলীনের সবুজে ঘেরা বিশাল মুসলিম গোরস্থানে। ফিউনারেল হোমে তাকে গোসল করানোর সময় আমার ছোটখালা লীনা আমার গলা জড়িয়ে ধরে প্রচুর কাঁদলেন। পাপা’র বিরুদ্ধে কিছু কিছু অভিযোগও করলেন মামের প্রতি পাপা’র অবহেলার জন্য।কিন্তু মামের আ্যক্সিডেন্টের পেছনে পাপা’কে দায়ী করার মত কোন কারন নিউইয়র্ক পুলিশের মত আমি নিজেও খুঁজে পাইনি। মাম সম্ভবত অসাবধানতাবশতঃ পা ফসকে পড়ে গিয়েছিলেন। তাছাড়া মাম বেঁচে থাকতে নিজে কখনও কোনও কারনে পাপা’র বিরুদ্ধে কোন অভিযোগের আঙুল তোলেননি। তাই সঙ্গত কারনেই মামের অনুপস্থিতিতে অন্যের প্ররোচনায় নিজের বাবাকে আমি অভিযুক্ত করতে পারি না।তাই আমাদের বাপমেয়ের সম্পর্কে আজ অব্দি কোন চিড় ধরেনি। এরপর থেকে আমরা বাপ-বেটি মা’য়ের প্রতি মৃত্যু বার্ষিকীতে কিছু তাজা ফুল কিনে কবর জেয়ারত করতে যাই। বাঁধাই করা কবরের পাশে দু’জন চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকি।তখন শ্যামবর্ণা মামের গালে টোল ফেলা হাসিমুখটি আমার খুব মনে পড়ে। আমার চোখ জলে ভরে যায়। পাপা আমাকে কাঁদার জন্য সময় দেন। থমথমে গম্ভীর মুখ করে নিরবে আমার হাত ধরে বসে থাকেন। আমি ফিরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াই। নিরবতা ভেঙ্গে বলি, “পাপা,  মাম’কে খুব মিস করি পাপা”! পাপা আমায় জড়িয়ে ধরে হাঁটতে শুরু করেন। তারপর ফিসফিস করে ধরা গলায় বলেন, “দোলা’র সাথে আমাদের আবার দেখা হবে, মা। সে যেখানে আছে নিশ্চয়ই ভালো আছে।” আমরা শোকাহত বাপ-বেটি হাত ধরাধরি করে বাড়ি ফিরে আসি। মায়ের নিজের পছন্দ করে কেনা, নিজ হাতে সাজানো বাড়িতে। আমার এই ত্রিশোর্ধ জীবনে বহুবার প্রেম এসেছিল। নিউইয়র্কে জন্ম নেয়া এবং বড় হয়ে ওঠা আমার এই শরীরটির গরন বাঙালি ধাঁচের হলেও স্বভাব ও রক্তে মিশে আছে পশ্চিমা সংস্কৃতির ছোঁয়া।তাই বল্গাহীন স্বাধীন ঘোড়ার মতই আমার জীবন। রাজকীয়। তবে প্রেম এবং সেক্স করার জন্য সঙ্গী নির্বাচনে আমি মন এবং ব্রেন এই দুটোকেই খুব প্রাধান্য দেই। হ্যাঙ্গআউট করতে গিয়ে নেশার ঘোরে কারও সাথে শুয়ে পড়ার রেকর্ড অন্তত আমার জীবনে নেই। সম্পর্ককে বিছানা পর্যন্ত নিতে আমি কিছু নিয়ম নীতি মেনে চলি। গায়ে, মুখে বোঁটকা গন্ধ আর ব্যাক্তিত্বহীন কোন পুরুষের ঠোঁটে চুমু খেতে আমার গা গুলিয়ে ওঠে। কারও বশ্যতা মেনে নিতে হবে বুঝলেই উঁচাটন হয়ে ওঠে আমার মন। তাই পোষ মানাতে চাওয়া পুরুষদেরও নকআউট হতে বিলম্ব হয় না।তারা আমায় বুঝে উঠতে পারে না। আমিও নিজের কাজ আর লক্ষ্যে কোন কম্প্রমাইজ করার কথা ভাবতে পারি না। একারনেই, এখনও সংসার শুরু করার জন্য কারও সাথেই ব্যাটেবলে হয়নি। এমন কারও সাথে এখনও ঝুলে পড়তে হয়নি; যাতে অনুশোচনা করে বলতে হয় “আই চ্যুজ আ্যা রং পার্সন”!  তাই কিছুদিন লিভিং টুগেদার করে, গুডবাই বলে, ঘুরেফিরে নিজের শৈশবের বাড়িতে, নিজের ঘরেই বার বার ফিরে আসি। বিশাল বড় বাড়ির দু’প্রাণ্তে বাপ-বেটি যার যার জীবন নিয়ে পড়ে থাকি। কদাচিৎ দু’জনের দেখা হয়। বেশীরভাগ সময়ই কথা হয় ফোনে। জরুরী কথাবার্তা চালাচালি হয় ম্যাসেন্জারে। ২০৩০ এর দিকে আমাদের জীবন অবিশ্বাস্য রকমের বদলে গেল। সেই সময় আ্যামাজন বাজারে নিয়ে এলো মানুষের অবয়বে তৈরি রবোমানুষ আ্যলেক্সাকে।আ্যালেক্সার এই নতুন ভার্সন অবিকল মানুষের মত দেখতে। সে পাশে বসে ঠিক মানুষের মতই কথা বলে।আ্যালেক্সার গলায় সহানুভূতি, মায়া, মমতার ছোঁয়া সহজেই হৃদয় স্পর্শ করে। এখন আমাদের বাসায় সাহায্যকারী হিসেবে আছে এই রবোকন্যা আ্যলেক্সা। পাপা’কে সময়মত ওষুধ খাওয়ানো, খাবার তৈরি, ডিস ওয়াস, ঘর ক্লিন, কাপড় ইস্ত্রি, হেন কাজ নেই যা আ্যালেক্সা পারে না। আমি পরম নিশ্চিন্তে আ্যালেক্সার হাতে ঘরবাড়ি আর পাপা’কে সঁপে দিয়ে নিজের গবেষণা নিয়ে আরও ব্যাস্ত হয়ে যাই। মার্কিন সামরিক গবেষকরা মানুষের হারানো স্মৃতি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়ে “মেমরি ইমপ্লান্ট” নামে যে গোপন মিশনটি চালু করেছিল, আমার গবেষণার ক্ষেত্রটি সেখানে। প্রযুক্তিগতভাবে এই অসাধ্য সাধন খুবই আশাব্যান্জক হলেও  নৈতিক, আইনগত ও সামাজিক দিক থেকে এই গবেষণা আজও আগেরমতই প্রশ্নবোধক হয়ে আছে৷ তাই আমার কাজ নিয়ে যত্রতত্র কথা বলার স্বাধীনতা আমার একদমই নেই। তবে মাঝেমধ্যে বাপবেটি একত্রে ডিনারে বসলে এসব বিষয় নিয়ে অনেক গল্প হয় নিজেদের মধ্যে। পাপা’র নিজের যদিও আমার গবেষণার বিষয়বস্তু সম্পর্কে স্বচ্ছ কোন ধারনা নেই।তাই ছোটবেলার মত এখনও নিজের নানা কৃতিত্বের, বিজ্ঞানের নতুন নতুন বিস্ময়কর আবিস্কারের গল্প বলে পাপা’কে তাক লাগিয়ে দিতে আমার ভাল লাগে। আগে সে অবাক হওয়ার ভান করে আমার গল্প শুনতো। কিন্তু আজকাল সে সত্যি সত্যিই অবাক হয়ে যায়। বিস্ফারিত চোখে, হা করা মুখে আমার গল্প শোনে। আমি পাপা’র সাথে “ব্রেনহ্যাকিং” “ব্রেনজ্যাকিং” এর মত ইন্টারেস্টিং বিষয়গুলো নিয়ে নানা গল্প করি। ব্রেনহ্যাকিং এর প্রভাব মানুষকে আজ কোথায়, কতদূর নিয়ে এসেছে ২০২০ সালের সেই গবেষকরা, যারা এটা শুরু করেছিলেন, তারা তখন তা কল্পনাও করতে পারেননি। করা সম্ভবও ছিল না। তখন পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্র ছিল স্থলপথ, নৌপথ, আকাশপথ, মহাকাশ আর সাইবারস্পেস। কিন্তু অচিরেই মানুষের ব্রেন ষষ্ঠ রণক্ষেত্রে হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। এখন লড়াইটা হল ধনী, প্রতিভাবান, বিখ্যাত ও প্রভাবশালী মানুষ বনাম হ্যাকারের। হ্যাকাররা এখন বেছে বেছে এসব মানুষের ব্রেন হ্যাক করে তাদের ব্লাকমেইল করছে। একটু বয়স হলে, বা দীর্ঘদিন পর আমাদের অনেক স্মৃতিই আমরা মনে রাখতে পারি না। তার জন্য খেসারতও দিতে হয়! আলজাইমারে আক্রান্ত রোগী বা দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পাওয়া মানুষের স্মৃতিভাণ্ডারের কিছু অংশ অনেকসময় পুরোপুরি হারিয়ে যায়। তখন সেই মানুষটির জীবনে একটা জটিল সমস্যা তৈরি হয়। সেই ২০১৩ সাল থেকেই মেমরি ইমপ্লান্ট’ নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গবেষকরা গবেষণা শুরু করেছিল। মানুষের মাথায় ইমপ্লান্ট বসিয়ে তার ‘মিসিং লিংকগুলো' আবার ভরাট করার তোড়জোড় চলছিল। যদিও আমজনতার কানে এসব খবর খুব কমই পৌঁছাতে পারত। বরাবরই এসব গবেষণার কাজ খুবই গোপনে হয়। ওবামা আমলে মানুষের ব্রেণের রহস্য উন্মোচনের জন্য দশ কোটি ডলার বাজেটের একটি উদ্যোগ নেয়া হয়। উদ্দশ্য ছিল একটি ‘মেমরি স্টিমুলেটার' তৈরি করা। এই ‘মেমরি স্টিমুলেটার' স্মৃতি হারানো মানুষের স্মৃতিভাণ্ডারকে জাগিয়ে তুলে জীবনকে বদলে দিতে পারে৷  আমার নিজের কাছেতো মানুষের মাথাটা একটি রহস্যবাক্স বলেই মনে হয়। এই প্যান্ডোরা বক্সে কী চলছে, কী হচ্ছে তা জানার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করছে বিভিন্ন দেশের গবেষনা প্রতিষ্ঠান এবং গবেষকরা। কিশোরি বয়সের একটা সময়ে এসে এই বিষয়টি আমাকে ভীষনরকম কৌতুহলী করে তুলেছিল। সেই থেকেই এই বিষয়গুলো নিয়ে আমি প্রচুর ঘাঁটাঘাঁটি, পড়াশোনা শুরু করেছিলাম। আমার বয়সি অনেকের কাছেই যা ছিল একটু অস্বাভাবিক।এত গবেষণা, এত পরীক্ষা নিরীক্ষার পরও মানুষের মন বা ব্রেনের কতটুকুই বা আমরা জানতে পেরেছি? আমার মত ঝানু নিউরোবিজ্ঞানীরও মাঝেধ্যেই মনে হয়, মানুষের চিন্তাশক্তি, মেধার অনেকটাই এখনও রয়ে গেছে রহস্যের চাদরে মোড়ানো। নিজে বিজ্ঞানী হয়েও ইদানীং আমার কেবলই মনে হয়, কিছু রহস্য অটুট থাকাই প্রয়োজন। সব কিছু জানতে গিয়ে আমরা যেন লেজেগোবরে করে ফেলছি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে পাপা ইদানীং কানে বেশ কম শুনছেন। তাই ডাক্তার তাকে হিয়ারিং এইড ব্যাবহার করতে দিয়েছেন। পাপা’র স্মৃতি শক্তিও ধীরে ধীরে কমে আসছে। কোন এক অজানা কারনে স্মৃতি পরিবর্তন করার খবরগুলো তাকে বেশ উৎসাহিত করে তোলে।একরাতে ডিনার টেবিলে বাপবেটি মিলে খেতে বসেছি। কথা প্রসঙ্গে পাপা জানতে চাইলেন, “হ্যারে মা, ব্রেনজ্যাকিং এর ব্যাপারটা কী বলত?” আমি তখন মাত্র আমার ফিস স্যান্ডউইচে বড় একটা কামড় বসিয়েছি। আমি অবাক হয়ে দু’চোখ বিস্ফারিত করে পাপা’র মুখের দিকে তাকালাম। তারপর দ্রুত মুখের চর্বিত স্যান্ডউইচটুকু গিলে ফেলে হাসতে হাসতে বললাম, “পাপা, শেষপর্যন্ত তুমিও ব্রেনজ্যাকিং, ব্রেনহ্যাকিং নিয়ে গবেষণা শুরু করলে নাকি?” পাপা বিব্রত ও বিষন্ন স্বরে বললেন, “বয়স হলে মানুষ এমনিতেই অনেক স্মৃতি ভুলে যায়, তা সত্যি। কিন্তু কষ্টের স্মৃতিগলো কখনও সে চাইলেও ভুলতে পারে না।” আমি বিস্মিত হয়ে ভাবলাম, পাপা’র জীবনে কী এমন দুঃসহ স্মৃতি আছে যা সে ব্রেনজ্যাকিং করে ভুলে থাকতে চায়? পরক্ষণেই মনে হল, নিশ্চয়ই মামের আ্যাক্সিডেন্টের স্মৃতিটা পাপাকে পীড়িত করে তোলে। হয়ত সে সেই বিভৎস করুন স্মৃতি ভুলে থাকতে চায়। প্রিয়জনের অপঘাতে মৃত্যু সহ্য করা খুব কঠিন। আর মাম এর আ্যাক্সিডেন্টের পর পর পাপা’ই একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসেবে সামনে ছিলেন। তবে আমার ভাগ্য ভাল। আমাকে মামের রক্তাক্ত অচেতন শরীর দেখতে হয়নি।তা না হলে সারা জীবন সেই দুঃসহ স্মৃতি আমাকেও বয়ে বেড়াতে হত “মেমরি স্টিমুলেটার” ও “ব্রেনজ্যাকিং” এসব নিয়ে আমাকে প্রচুর পড়াশোনা আর কাজ করতে হয়। তাই সুযোগ পেয়েই এই বিষয়টি নিয়ে আমি খানিকটা জ্ঞানগর্ভ ভাষন দিয়ে পাপা’কে ভড়কে দিলাম। আজও পাপা’কে ভড়কে দিতে পারলে আমি একধরনের ছেলেমানুষি আত্মতৃপ্তি পাই। বললাম, “পাপা, ভাব একবার, কোন বিশ্বে আমরা বাস করছি। কী হচ্ছে তোমার চারপাশের জগতে!” তবে ব্রেনজ্যাকিং এর মাধ্যমে মানুষের আবেগ এবং আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করা সত্যিই সম্ভব হচ্ছে জানতে পেরে পাপা খুবই বিস্মিত হলেন।তাকিয়ে দেখি আমার পিতৃদেবের চক্ষু একেবারে চড়কগাছ! আমাদের সংসারে আমরা তিনটি মাত্র প্রাণী। আমি পাপা আর মার্লো। তাই বাড়িতে এলে আমার কথা বলার একমাত্র সঙ্গী হন পাপা। এমন অনেক গোপন কথা থাকে যেগুলো বাইরের মানুষের সাথে শেয়ার করার কোন উপায় নেই। আমার সেসব কথার শ্রোতা পাপা এবং মার্লো। মার্লো’র নিজের তথ্য ফাঁসের কোন সুযোগ নেই। তাই তার উপস্থিতি বাড়ির সর্বত্র অবারিত। আমাদের বেশীরভাগ সময়ই নানা বিষয়ে কথাবার্তা হয় ডিনারের টেবিলে। পাপা আর আমি দু’জনেই ধীরেসুস্থে আয়েস করে ডিনার খেতে পছন্দ করি। আ্যলেক্সা ডিনার রেডি করে দিয়ে ওর জন্য নির্দিষ্ট ঘরের আউটলেট থেকে চার্জ নিতে চলে যায়। খাবারের এই সময়টাতে আমি ইচ্ছে করেই পাপা’র স্মর্টফোন এবং আ্যলেক্সাকে দূরে সরিয়ে রাখি। সারাদিন রবোট, যন্ত্রপাতি আর কম্পিউটার নিয়ে কাজ করার পর ঘরের একান্ত পারিবারিক সময়টুকুতে এদের উপস্থিতি আর ভাল লাগে না আমার।তাছাড়া এই যুগে যন্ত্রই হল মানুষের গোপন তথ্য চুরি এবং পাচারের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। এরাই গুপ্তচরের কাজ করে।তাই এদের একটু দূরে রাখাই নিরাপদ! “হরহর করে কিসব যে বললি সেদিন।” আরেক রাতে খেতে খেতে পাপা কথা পারলেন। “কই আমার জানামতে কাউকেতো শুনলাম না তার স্মৃতি চুরি হয়েছে।”   আমি বেশ গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে বক্তৃতার ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলাম, “শোন তবে, আগে হ্যাকিং বলতে অন্যের কম্পিউটার থেকে তথ্য চুরি, আইডি চুরি এইধরনের কাজগুলোই হতো। কিন্তু এখনতো ব্যাংক ডাকাতির মত মানুষের “স্মৃতি” পর্যন্ত হাইজ্যাক হয়ে যাচ্ছে। মানুষকে তার  মহামূল্যবান স্মৃতিগুলো রক্ষার জন্য সারাক্ষণ তটস্থ হয়ে থাকতে হচ্ছে। বোঝ এবার, স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করার সেই মহৎ উদ্দেশ্য এখন বুমেরাং হয়ে মানুষের জন্য অশনি সংকেত বয়ে এনেছে। কিন্তু পাপা, এসব হল রুই কাতলাদের ব্যাপার স্যাপার। তুমি চুনোপুঁটি বলে এখনও তোমায় কেউ গোনায় ধরছে না। একদিন দেখবে এসব ক্ষেত্রেও ছিঁচকে চোর বের হবে। তখন আমাদের মত সাধারণ লোকজনও বিপদে পড়বে। সে সব দিন এলো বলে।” আমি পাপা’র প্লেটে এক টুকরো হোয়াইট ফিস তুলে দিতে দিতে আমার ভাষন শেষ করলাম। “মুসুরের ডালের সাথে টমেটো মেশানো এই স্যুপটার স্বাদ কিন্তু অসাধারণ হয়েছে। কি বলিস?” আমার লম্বা বক্তৃতা শুনতে শুনতে স্যুপটুকু পুরোটা শেষ করে পাপা তৃপ্তির সাথে বললেন।   “হুম, আ্যলেক্সা’কে যেসব খাবারগুলোর জন্য প্রোগ্রাম করা আছে, সেগুলো সে তৈরি করে খুব চমৎকার। জান পাপা, মাম যে শর্ষেইলিশ করতো তার স্বাদ যেন এখনও আমার মুখে লেগে আছে। কতকাল সেসব খাবার আর খাই না।আই রিয়েলি মিস মাই মম!” মামের প্রসঙ্গ এলেই আমাদের ঘরের বাতাস কেমন যেন ভারী হয়ে যায়। আমি লক্ষ্য করলাম, পাপা অসস্তি ফিল করতে শুরু করেছেন। পাপা’র বয়স বাড়ছে। কষ্টকর স্মৃতির ধকলগুলো সে আসলেই আর নিতে পারে না। আমি তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বললাম,  “জান পাপা, হেডসেট ব্যবহার করা হয় এমন কিছু জনপ্রিয় গেমিং থেকে মানুষের ব্রেনওয়েভ মনিটর করে ব্যাংক কার্ডের পিন নম্বর, পাসওয়ার্ড, এমন অনেক গোপন তথ্য বের করে ফেলছে তুখোর হ্যাকাররা। আজকে এটা নিয়ে নিউজ এসেছে। দেখনি?”   “ব্রেনজ্যাকিং এবং স্মৃতি পরিবর্তন” জাতীয় ব্যাপারগুলো নিরাপত্তার জন্যে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বুঝতে পেরে উৎসাহ হারালেন পাপা। বললেন, “হুম, নিজের মাথা নিয়ে নিজের ঘরে বসে থাকাই এখন নিরাপদ। কোথায় গেলে কে যে কী করে বসবে, কে জানে”। আমি হাসতে হাসতে বললাম, “তাই বলে তোমায় সারাক্ষণ ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকতে হবে না। তবে আলেক্সা এবং তোমার স্মার্টফোনের সাথে কোন গোপন তথ্য যেন শেয়ার করতে যেয়ো না। এই যন্ত্রগুলোই এখন গুপ্তচরের কাজ করছে। এরা এদের মেমরিতে তোমার সব তথ্য জমা করে রাখছে”। “হিউম্যান কানেকটোম প্রজেক্ট” নিয়ে কাজ শুরুর সময় আমাদের লক্ষ্য ছিল মানুষের ব্রেইন রোবটের সাথে সংযুক্ত করে তা বিশ্লেষন করা। ২০২০ এ যখন আমি সবেমাত্র এই গবেষণার কাজে যুক্ত হয়েছি, তখন টেকনোলজিতে এগিয়ে থাকা ইলন মাস্কের নিউরোলিংক, ফেসবুক, ব্রায়ান জনসনের কার্ণেল, ইমোটিভ, ডার্পা এসব কোম্পানিগুলো তাদের গবেষণায় বেশ সফল হতে শুরু করেছে। এগুলোর মধ্যে ডার্পা হল আমেরিকান সামরিক বাহিনীর গবেষনা কেন্দ্র। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এসব গবেষনা এবং প্রযুক্তির অপপ্রয়োগ হতে সময় লাগেনি। এসব নিয়ে মিডিয়াতে প্রতিদিনই নতুন নতুন নিউজ আসছে। নিউরোসায়েন্স ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে “ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেস টেকনোলজি”র উদ্ভব হল। এই “ইন্টারফেস” মানুষের ব্রেইনকে কম্পিউটার ডিভাইসের সাথে কানেক্ট করে। এবং সেন্সরি মোটর ফাংশন গুলোতে উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু মানুষের সাথে যন্ত্রের এই সরাসরি সংযোগ মানবব্রেইনকে আরও বেশী হ্যাকিং এর ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলে হ্যাকাররাও মানবব্রেইনের উপর বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এখন টেকনলজি ও ব্রেনের সাহায্যে যন্ত্রকে দূর থেকেই নিয়ন্ত্রন সম্ভব। তেমনি মানবব্রেইনকেও কিন্তু যন্ত্রের মাধ্যমে দূর থেকে নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব হচ্ছে। যখনই প্রযুক্তি এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুললো, ওমনি কিছু ধনবান মানুষ মোটা অংকের টাকা খরচ করে জীবনের প্রিয়তম, মধুময়, সুখময়  স্মৃতিগলো ফিরিয়ে আনতে শুরু করল। অথাৎ অর্থ খরচ করে বাজার সদাই করার মতই তারা “সুখ” কিনতে শুরু করল। সেই পুরনো দিনের ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রাম ফিডের মতো মানুষ এখন তাদের স্মৃতিগুলোও স্ক্রল করে টিভি বা কম্পিউটারের স্ক্রীনে দেখতে পারছে। মানুষের ব্রেনের উপর এমন ‘ম্যানিপুলেশন এর পরিণাম কিন্তু ভাল হয়নি। বাছাই করা নির্দিষ্ট কিছু স্মৃতি ফিরিয়ে আনা বা মুছে দেয়া প্রযুক্তি ব্যাবহারের কারনে ভূক্তভোগী কিছু মানুষতো তার নিজের আসল পরিচয়ও ভুলতে বসেছে।  মানব স্মৃতিভাণ্ডারের মতো জটিল কাঠামো নিয়ে কাজ যে অত্যন্ত কঠিন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ হারানো স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে বিশেষজ্ঞরা তাই নানা পথ বের করেছেন। প্রথম পথ হলো, মাথার স্মৃতি ভরা অংশ ‘হিপোক্যাম্পাস' এ প্রয়োজনীয় স্পন্দন সৃষ্টি করা৷ তবে নির্দিষ্ট কিছু স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে হলে সেই মানুষটির সুনির্দিষ্ট ‘মেমরি প্যাটার্ন' জানা প্রয়োজন৷  সারাদিন পর বাড়ি ফিরে এসব খটমটে বিষয় নিয়ে আলাপ আর কাহাতক করা যায়? তাছাড়া এসব জটিল তথ্যতো পাপা’র  বোঝারও কথা না। তার সাথে এসব নিয়ে গল্প করতে হলে আমাকে আরও সহজ ও ঘরোয়া ভাষায় এসব ব্যাখ্যা করতে হয়। এইসব জটিল বিষয়গুলো খেতে খেতেই যথাসম্ভব সরল করে আমি পাপা’র কাছে বলার চেষ্টা করি। সে হয়ত কিছু বোঝে। কখনও কিছু না বুঝেও মাথা নাড়ে। পাপা’র সাথে আর কী নিয়ে কথা বলব তাও আমি ভেবে পাই না। আমার বিদ্যের দৌড়তো এই নিউরোসাইন্সেই সিমাবদ্ধ।আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর, টুকটাক কথাবার্তার পর আমাদের সব কথা একসময় ফুরিয়ে যায়।আমরা চুপচাপ বসে খেতে থাকি। মাঝেমধ্যে পাপা আমার বিয়ের কথা তোলেন। আমি বিরক্ত হলে বিরস মুখে চুপ করে বসে থাকেন।পাপা’র এইরকম হতাশ, বিরশ মুখ দেখতে আমার খুব কষ্ট হয়।  আর ঘরগেরস্তি, চাল, ডাল, নুন, মরিচের হিসেব নিয়ে যে দুটো কথা বলবো তার কিছুই আমার জানা নেই। গেরস্তি ডিপার্টমেন্ট আ্যলেক্সার অধীনে। কি কি ফুরিয়ে গেছে তার লিস্ট তৈরি করা, বাজারে অর্ডার সাবমিট করা এসব সেই করে। বাজার করা, তৈজসপত্র প্যাকিং এবং সেসব দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে যায় তিতৃয় শ্রেণীর রোবটরা। তারা সেভাবেই প্রোগ্রাম করা। পাপা’র স্বাস্হ্যগত মনিটরিং এর দায়িত্বও পালন করে আ্যালেক্সা। শুধু বড় কোন সমস্যা হলে সে তা আমার নজরে আনে। তখন আমরা হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে যাই। মাঝেমধ্যে ছুটিছাটায় কোন আত্মীয় বাড়িতে বা দূরে কোথাও ভ্যাকেশনে যাওয়া হয়। অবশ্য বাইরে ঘোরাঘুরি, বেড়ানো পাপা তার পুরনো দিনের বন্ধুদের সাথে করতেই বেশী ভালোবাসে। বাড়ির এই রুটিন করা জীবন এবং দিনের পর দিন ল্যাবে যন্ত্রপাতি নিয়ে পড়ে থাকতে থাকতে যখন সত্যিই হাঁপিয়ে উঠি তখন মাঝেমধ্যেই খুব ইচ্ছে করে খুব সাধারণ একটি মেয়ের মতই সাধারণ ঘরোয়া জীবন কাটাতে। একজন খুব আপন, খুব পরিচিত পুরুষের গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়তে। নতুন সহকর্মী ব্রায়ান এর সাথে ইদানীং একটা ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছে আমার। আমরা কিছুদিন হল ডেটিং শুরু করেছি। ব্রায়ানের চুমু খাওয়ার স্টাইল খুব আকর্ষণীয়। বিছানায় তার সাথে আমার আন্ডারস্টান্ডিং চমৎকার।  ব্রায়ানের ভালোবাসায় বেশ একটা মোহ আছে। ওর সাথে কাটানো সময়গুলো আমি যেন তাড়িয়ে তাড়িয়ে এনজয় করছি। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কেটে যাচ্ছে দিনগুলো। ইতোমধ্যেই মনে মনে একটা ভয় আমার ভেতর দানা বেঁধে উঠছিল। মনে হত, আমি বোধহয় খুব শুকনো। খুব রসকষহীন। আমাকে হয়ত সারা জীবন এভাবে একাই কাটিয়ে দিতে হবে। কেবলই বই পড়া, গবেষণা করা, আর যন্ত্রপাতি নিয়েই কাটবে আমার জীবন। কিন্তু মনে হচ্ছে ব্রায়ান আমার মন ও শরীরের গুপ্ত ম্যাজিক চাবিটির সন্ধান পেয়েছে। সে আমাকে বুঝতে পারে, আমার মন পড়তে পারে। সে জানে কিভাবে শারীরিক সুখ দিতে হয়। বিছানায় আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে খুব উৎসাহিত করে তোলে। দুজনার একান্ত সময়টুকু দারুনভাবে উপভোগ করছি আমরা। ও ছুঁয়ে দিলেই আমার শরীরে যেন জোয়ার আসে। এর আগে অন্য কারও সাথেই এমনটি হয়নি। ক’দিন ধরেই মনে মনে ভাবছি, এবার সময় এসেছে ব্রায়ানের সাথে পাপা’কে পরিচয় করিয়ে দেয়ার। পাপা’কে বলব, “পাপা, আমি তাকে অবশেষে খুঁজে পেয়েছি। যাকে এতদিন খুঁজছিলাম!” এক রাতে এক বাঙালি বন্ধুর বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফিরে এসে সবে ঘরে ঢুকেছি। আমাদের পোষা কুকুর মার্লো এসে খুব অদ্ভুত কান্ড শুরু করল। সে আমার শাড়ির আঁচলটি টেনে ধরে আমার গায়ের সাথে এসে কাইকুই শুরু করলো। তার সেই বিচিত্র ভাষা বুঝতে না পারলেও অনুভূতিটুকু বুঝতে আমার দেরী হল না। মামের ব্যাবহৃত কোন জিনিষ দেখলেই সে এমন কান্ড শুরু করে। সেই জিনিষটি সে লুফে নিতে চায়। সেটি নিয়ে লুটোপুটি শুরু করে। এই শাড়িটি মামে’র। হাল্কা আকাশি জমিনে সাদা শরু পাড়ের এই সিল্ক শাড়িটি তার খুব প্রিয় ছিল। মাম এই শাড়ির সাথে সাদা মুক্তোর গয়না পড়তেন। আমিও আজ সেই গয়নাগুলো পড়েছি। হয়তো মার্লোর চোখে আজ আমাকে মামে’র মতই লাগছে। আহা, বেচারি মার্লো। মাম চলে যাবার পর সেও বড্ড একা হয়ে গেছে। ছোটখালা তার কুকুর বার্থা’র দুটো বাচ্চা হবার পর একটি বাচ্চা মাম’কে উপহার দিয়েছিল। মাম ওর নাম রেখেছিলেন “মার্লো”। মার্লো তার জন্মের কয়েক মাস পরই আমাদের বাড়িতে এসেছিল। সেই মার্লোও দেখতে দেখতে এখন বুড়ো হতে বসেছে। মার্লোর মৃত্যু হলে মামে’র এই স্মৃতিটিও আমাদের জীবন থেকে চলে যাবে। আমি পাশে বসে আদোর করে মার্লো’র বাদামি রঙের লোমশ শরীরে হাত বুলাতে শুরু করলাম। সে বাচ্চাদের মত খুব সরু গলার কেমন একটা করুন সুরে কাঁদতে শুরু করল।সেই কান্নার সুর আমাকে বিহ্বল করে তুললো। আমি অবাক হয়ে মার্লো’র মুখের দিকে তাকালাম। তার কালোমার্বেলের মত কাঁচসচ্ছ দু’চোখে তখন উপচে পড়া অশ্রু। আমার বুকে খুব বড় রকমের একটি ধাক্কা খেলাম। এই বোবা প্রাণীটি তার মনের কষ্ট আমার সাথে শেয়ার করতে চাইছে। যেমন আমি আমার কষ্টগুলো পাপা বা খালাদের সাথে শেয়ার করি। আমি আমার মা হারিয়েছি। মার্লো তার বন্ধু হারিয়েছে। যে তাকে পেলেপুষে বড় করে তুলেছিল। মাম’ই ছিল তার হাঁটার, খেলার একমাত্র সাথী। তাই মামের মৃত্যুর পর মার্লো বেশ কিছুদিন খুব উপদ্রব শুরু করেছিল। মামে’র ছবি, জুতো, স্যান্ডেল, জামা-কাপড় যাই কাছে পেতো, টেনেহিচড়ে সেসব নিয়ে, সারা ঘরময় ছুটোছুটি করে সব তছনচ করতো। কিন্ত তারপর একসময় সে খুব শান্ত হয়ে গেল। যেন বুঝতে পেরেছে এসব প্রতিবাদে তার মনিব আর কখনও ফিরে আসবে না। আজ বহুদিন পর এই পরিচিত শাড়ি, গহনা আর শাড়ির সাথে জড়িয়ে থাকা মামে’র শরীরের ঘ্রাণ হয়তো তার পুরনো স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে।  হঠাৎ করেই আচমকা আমার মাথায় একটি বুদ্ধি এলো। মার্লো’র মাথায় “চিপ” লাগিয়ে আমি অনায়াসেই তার স্মৃতিগুলো আমার কম্পিউটারের মনিটরে স্ক্রল করে দেখতে পারি। তাতে হয়তো মাম’কে নিয়ে মার্লোর বিশেষ কোন স্মৃতি, মনের ভেতরে বয়ে যাওয়া আবেগের ঝড় খানিকটা হলেও আমি আঁচ করতে পারবো। উথলে ওঠা আবেগের একটা জোয়ার যেন আমাকেও বশীভূত করলো। আমি মার্লো’কে নিয়ে আমার হোম অফিসে গেলাম। ওয়ার্ক স্টেশনের পাশে রিলাক্স করার জন্য রাখা রকিং চেয়ারটিতে ওকে বসতে বলতেই সে বাধ্য ছেলের মত চারপা গুটিয়ে বসে পড়ল। মার্লো’র কপালের একপাশে একটি “চিপ” বসিয়ে আমি আমার কম্পিউটার অন করলাম। নির্দিষ্ট আ্যাপ ওপেন করতেই কম্পিউটারের স্ক্রিনে নানা রঙের অনেকগুলো ওয়েভ আসতে শুরু করলো। তারপর সেই ঠেঁউ আরও পরিস্কার হয়ে সেখানে পুরনো দিনের চলচিত্রের মত সাদাকালো দৃ্শ্যপট ফুটে উঠল।  একটা ফুটেজে মাম, মার্লো আর আমি লনে বসে আছি। মার্লো’র দুই থাবার মধ্যে একটি  বল ধরা। আমি হাত নেড়ে মার্লোকে ডাকছি। সে বল ছুঁড়ে দিয়ে মামের পায়ের কাছে গিয়ে লুটোপুটি শুরু করল। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বিরস মুখে পাশের চেয়ারে এসে বসে পড়লাম। অন্য একটি ফুটেজ শুরু হল। মাম কাজে বের হয়ে যাচ্ছে। মার্লো গেট পর্যন্ত এসে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে মামের গমন পথের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আরেকটি ফুটেজে, মাম আর মার্লো আমাদের বাড়ির সামনের ফুটপাত ধরে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে কারো সাথে মাম দাঁড়িয়ে কথা শুরু করল। মার্লো সম্ভবত হঠাৎ থেমে যাওয়ায় বিরক্ত। অথবা সে মানুষটিকে পছন্দ করছে না। তাই উচ্চস্বরে ঘেউঘেউ করে মাম’কে গল্পে বাঁধা দিতে চেষ্টা করছে। আমি ক্লোজআপ করে মানুষটির মুখ দেখার চেষ্টা করলাম। ওহ্ আচ্ছা! এতো দেখছি আমাদের প্রতিবেশী সান্তা মারিয়া। কলম্বিয়ার মেয়ে। এই পাড়ায় নতুন এসেছে তখন। লক্ষ্য করেছি, কোন কারনে মার্লো এখনও মারিয়াকে অপছন্দ করে। মার্লো’র নড়াচড়া বন্ধ করার জন্য আমি ওর গলায় ঘারে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। আরামে তার চোখ লেগে এসেছিল। হঠাৎ আকস্মিক কিছু স্মৃতি এসে মার্লোকে যেন নাড়িয়ে দিল। সে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কেঁপেকেঁপে উঠতে লাগলো। আমি একটু অবাক হয়েই মনিটরে আরও মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম। এই দৃশ্যে মাম দড়জা খুলে ঘরে ঢুকছে। মামের সাড়া পেয়ে মার্লো কোথা থেকে যেন ছুটে এলো। তারপর মামের পিছুপিছু সিঁড়ি ভেঙ্গে সেও দোতালায় উঠছে। তারা বেডরুমে ঢুকে গেল। কিন্তু কী আশ্চর্য। মামের বেডরুম থেকে অকসাৎ একটি চিৎকার ও হুটোপুটির শব্দ আসতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল মাম চিৎকার করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। তার পেছন পেছন পাপা। প্রায় অর্ধনগ্ন পাপা’র পেছনে এসে দাড়িয়েছে সম্পুর্ণ নগ্ন এক নারী। আমি ঝুঁকে পড়ে সেই নারীর মুখটিকে ক্লোজআপ করলাম। সান্তা মারিয়া! হতভম্ব আমার চোখের সামনেই কম্পিউটারের স্ক্রীনে মামের সাথে পাপা’র প্রচন্ড তর্কাতর্কি ও হাতাহাতি হচ্ছে। এক পর্যায়ে পাপা’র প্রচন্ড এক ধাক্কায় মাম সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে…পিছুপিছু দৌড়ে নামছে মার্লো।   আরেকটি নতুন ফুটেজ শুরু হল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় পাপা স্থানুর মত দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত তার নড়াচড়ার কোন শক্তি নেই। মার্লো বিস্মিত চোখে মুখ তুলে একবার পাপা, আরেকবার মাম’কে দেখছে। হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসা পুলিশের গাড়ি আর আ্যম্বুলেন্সের শব্দে যেন উপরে দাঁড়ানো মানুষ দুটোর হুঁশ ফিরে এলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই দেখা গেল দু’জনেই পোশাক পরে নিচে নেমে এলো। মার্লো মামে’র পায়ের কাছের প্যান্টের ঝুল ধরে টানাহেঁচড়া করে তাকে জাগানোর চেষ্টা করছে।ততক্ষণে মারিয়া পেছনের দরজা খুলে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল। সোয়েট প্যান্ট এবং ক্রু পরা পাপা হাঁটু ভেঙ্গে মামের রক্তাক্ত শরীরের পাশে বসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। আমি পরিস্কার অনুভব করলাম আমার পিতৃদেবের এই কান্না স্বজন হারানোর কান্না নয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিকে সামাল দেয়ার কান্না। আত্মরক্ষার কান্না। মনিটরে রাখা আমার চোখদুটো থেকে অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টির মত অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। ঘুমন্ত মার্লোর চোখ দুটোও শুকনো নেই। প্রচন্ড আবেগে আমার হাত পা ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছে। মনিটরে দেখা যাচ্ছে ইতোমধ্যে পুলিশ, ইমারজেন্সি চিকিৎসকদল সবাই ঘরে এসে জুটেছে। দু’একজন পাপা’র জবানবন্দী নিচ্ছে। কয়েকজন মিলে মামের প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করেছে।  একসময় তারা নেকব্রেস, অক্সিজেন মাক্স পরানো মাম’কে স্ট্রেচারে করে তুলে নিয়ে বের হয়ে গেল। তাদের সাথে ক্রন্দনরত বিপর্যস্ত পাপা’ও বের হয়ে গেল ঘর থেকে। অসহায়, বিমূঢ মার্লো বোবার মত ফ্যালফ্যাল করে বিকট শব্দ আর চোখ ধাঁধানো আলো ছড়ানো আ্যাম্বুলেন্সের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল। মামে’র খুনের একমাত্র সাক্ষী, ঘুমন্ত মার্লোর দিকে তাকালাম। ওর শরীরও থিরথির করে কাঁপছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভুভক্ত এই কুকুরটি তার স্মৃতির ভান্ডারে জমিয়ে রেখেছিল এই বিলিয়ন ডলার মুল্যের স্মৃতি। ভাগ্যিস ঘাতক তা জানতে পারেনি!

মন্তব্য