অর্থ-বাণিজ্য

সকালের সময় 'কোভিড-১৯' আপডেট
# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ 40321 7925 559
বিশ্ব 5,803,658 2,508,944 357,712

করোনার থাবা

অস্তিত্ব সংকটে সমবায়

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বিপর্যস্ত দেশ। করোনার থাবায় তছনছ দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য। থমকে আছে প্রায় সব কিছু। আমদানি-রপ্তানি বলতে গেলে অচল। কেউ ঘরের বাইরে যেতে পারছে না; তাই কাজ নেই কারো। এতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, দিনমজুর, হকার ও অতিদরিদ্ররা। এখন মানুষ করোনার অদৃশ্য ভাইরাসের পাশাপাশি খেয়ে-পরে টিকে থাকার যুদ্ধ করছে।
এ মরণপণ যুদ্ধে তাদের পাশে থেকে প্রায় একাই লড়ছে সরকার। সরকারের নগদ সহায়তা, শুল্ক-কর ছাড়, ব্যাংকঋণের সুদের হারে ছাড়, নানা রকম প্রণোদনা নিয়ে বেসরকারি খাত ফুলেফেঁপে উঠলেও এ দুর্দিনে সরকারের পাশে তাদের অনেককেই দেখা যাচ্ছে না। হাতে গোনা কয়েকটি গ্রুপ ও প্রতিষ্ঠান সহায়তা করলেও বেশির ভাগ শীর্ষ শিল্পগ্রুপ, বেসরকারি বহুজাতিক কম্পানি, সেরা করপোরেট প্রতিষ্ঠান, এনজিওর উপস্থিতি নেই। উল্টো তারা নিজের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নানা আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনা পেতে সরকারের সঙ্গে দেনদরবারে ব্যস্ত।
শুধু তাই নয়, অনেক বেশি সুবিধা নেওয়া কিছু কিছু খাত কাজ করিয়ে নেওয়া শ্রমিকদের এক মাসের মজুরি দেওয়ার জন্যও সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ কঠিন সময়ে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করে সফল হওয়া সেরা প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কম্পানির দ্রুত এগিয়ে আসা উচিত।
করোনাভাইরাসের প্রভাবে চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে দেশের প্রায় ২৪ হাজার সমবায়ী প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ ছুটির কবলে এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ঋণ আদায় ও সঞ্চয় কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আদায় ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে ঋণ বিতরণ করা সাধারণের সঞ্চয়ের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার। বেকার হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে সমবায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সরাসরি জড়িত ৯ লক্ষাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। অস্তিত্ব রক্ষার্থে এনজিও ঋণের মতো সমবায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনার অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাবেক সচিব ও সমবায় অধিদফতরের সাবেক নিবন্ধক মো: হুমায়ুন খালিদ জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসে বিশ্বের মতো আমরাও মহাসঙ্কটে পড়তে যাচ্ছি। বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক সঙ্কট শুরু হয়েছে। সামনে খাদ্য সঙ্কটের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের জন্য দেশের প্রায় লক্ষাধিক সমবায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখতে হবে। মিল্কভিটার মতো বিভিন্ন সমবায়ী প্রতিষ্ঠান যারা সরাসরি আয় উৎসারি কাজের সাথে জড়িত এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু রাখতে হবে।
আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা যাতে এসব কাজে বাধা না দেয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। একই সাথে এনজিওদের মতো সরাসরি ঋণকার্যক্রমের সাথে জড়িত প্রায় ২৪ হাজার সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, চলমান পরিস্থিতিতে যারা ঋণ নিয়েছেন, আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা সেটা পরিশোধ করতে পারছেন না। তাদেরকে আয় উৎসারি কাজে অংশগ্রহণ করতে অর্থের জোগান দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক যেমন এনজিওদের সদস্যদের মধ্যে ঋণ দেয়ার জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার তহবিল করেছে তেমনি সমবায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রণোদনার উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে এসব প্রতিষ্ঠানে যারা সঞ্চয় রেখেছিলেন তারা অর্থ ফেরত পাবেন না। তিনি মনে করেন, এ জন্য সমবায় মন্ত্রণালয়সহ সমবায় অধিদফতরকে এগিয়ে আসতে হবে। সাধারণ ছুটির মধ্যে সরকারি কর্মকর্তারা ঘরে বসে থাকলে, আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে গেলে একসময় তাদেরও বেতন-ভাতা বন্ধ হয়ে যাবে।
সমবায় অধিদফতর থেকে নিবন্ধিত সমবায়গুলো তাদের সমিতির সদস্যদের কাছ থেকে সঞ্চয় ও আমানত নিয়ে আবার সমিতির সদস্যদের মধ্যেই গাভী পালন, মিল্কভিটার মতো বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ঋণ প্রদান করে থাকে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, হকার, ছোট দোকানদার, বস্তিবাসীর মাধ্যমে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সঞ্চয় গ্রহণ ও ঋণ কার্যক্রম, ব্যাংকে এফডিআর সব মিলে বছর শেষে যে পরিমাণ মুনাফা হয় তা সমিতির সদস্যদের মধ্যে আনুপাতিক হারে বিতরণ করা হয়। কিন্তু দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ও লকডাউনের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে দীর্ঘ এক মাস যাবত সরকারি নির্দেশে প্রায় সব ধরনের অফিস বন্ধ রয়েছে। অধিকাংশ জেলা লকডাউন করা হয়েছে। এতে সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত ঋণকার্যক্রমসহ সব আর্থিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে সুযোগসন্ধানী কিছু সদস্য ঋণের কিস্তি, শেয়ার ও সঞ্চয় প্রদান বন্ধ করার সুযোগ চাচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সঙ্কটের মুখে পড়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশে ক্রেডিট ইউনিয়নগুলোর শীর্ষ প্রতিষ্ঠান কাল্ব’র সাবেক সেক্রেটারি নির্মল রোজারিও গতকাল জানিয়েছেন, বেশির ভাগ এলাকায় লকডাউন ও সাধারণ ছুটির মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো কাজ করতে পারছে না। এতে সমবায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যারা জড়িত আছেন তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। তারা সমবায় থেকে যে ঋণ নিয়েছিলেন তা পরিশোধ করতে পারছেন না। অপর দিকে সঞ্চয় ভাঙানোর একটি চাপ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় আনতে হবে। এনজিওদের মতো তাদেরও ঋণের ব্যবস্থা করলে প্রতিষ্ঠানগুলো সচল থাকবে। সদস্যরা ঋণের অর্থ ফেরত দিতে পারবেন।
ক্রেডিট ইউনিয়ন সম্প্রীতির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এমদাদ হোসেন মালেক জানিয়েছেন, নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হয় সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো। করোনাভাইরাসের কারণে সদস্যরা ঋণের অর্থ ফেরত দিতে পারছেন না। আবার যারা সঞ্চয় রেখেছিলেন তাদেরও সঞ্চয় ভাঙানোর একটি চাপ রয়েছে। সব মিলে প্রতিষ্ঠানগুলো আজ এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের জন্য সমবায় অধিদফতরসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসতে হবে। তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সমবায় অধিদফতর থেকে সুনির্দিষ্ট একটি সার্কুলার জারি করা একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন। বর্তমান সঙ্কটকালে সমবায় উন্নয়ন তহবিল থেকে বিনা সুদে তাদের ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে সব সমবায় সমিতির অর্জিত নিট মুনাফার ওপর ২০১৫ সাল থেকে আরোপিত ১৫ শতাংশ কর প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য মতে, দেশের পাঁচ কোটি মানুষ এখন দরিদ্র। করোনার কারণে নতুন করে দেশের আরো অন্তত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মানুষ দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে। কাজকর্মহীন এ বিপুল জনগোষ্ঠীর এখন দৈনন্দিন খাওয়া-পরা চালিয়ে যাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়ছে। সরকার তার অবস্থান থেকে শুধু দরিদ্র নয়; প্রতিটি খাতকেই সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক ও নীতিসহায়তা দেওয়া শুরু করেছে। এরই মধ্যে প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
যেখানে বড় বড় শিল্পগ্রুপ, লাভজনক প্রতিষ্ঠানই বেশি সুবিধা পাচ্ছে। বেসরকারি খাত যেহেতু অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, তাই তাদেরও টিকে থাকতে সরকার তাদের নগদ আর্থিক ও নীতিসহায়তা দেয়। অথচ এই দুঃসময়ে সামান্য কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া তাদের তেমন সাড়া নেই। সক্ষমতার নিরিখে শীর্ষ অনেক প্রতিষ্ঠানই অনুপস্থিত।
শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক ৩০ কোটি টাকায় প্রায় তিন লাখ দরিদ্রকে নগদ সহায়তা দিচ্ছে। দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগ্রুপ বসুন্ধরা গ্রুপ দুই হাজার বেডের হাসপাতাল তৈরিতে স্থাপনা দিয়ে সহায়তা করছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে ১০ কোটি টাকার আর্থিক অনুদান দিয়েছে। আর নিয়মিতভাবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের হাজার হাজার দরিদ্র মানুষকে খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে।
বেক্সিমকো গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, ইউনাইটেড গ্রুপ, ওয়ালটন, রূপায়ণ, আমিন মোহাম্মদ গ্রুপসহ সরকারি কর্মকর্তা, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে কিছু অর্থ সহায়তা করেছে। কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানও কয়েক কোটি টাকা করে আর্থিক অনুদান দিয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় সীমিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ অর্থনৈতিক জরিপ বলছে, দেশে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৭৮ লাখ। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর খুব ছোট একটি অংশ যদি এ দুর্দিনে এগিয়ে আসে তাতেও সরকারের ওপর চাপ কমে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন-আইএফসির সর্বশেষ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের উৎপাদনশীল কারখানার অংশীদারির দিক থেকে ৩৭ শতাংশ ক্ষুদ্র, ১৪ শতাংশ মাঝারি হলেও ৮ শতাংশ বৃহৎ শিল্পের হাতেই বিপুল পরিমাণ পুঁজি।
সংস্থাটির ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে নির্মাণ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত, পোশাক, টেলিযোগাযোগ, ইলেকট্রনিক, খাদ্য, স্টিল, মোবাইল, ওষুধ খাতের শীর্ষ ১৩টি প্রতিষ্ঠানের বছরে আয় ১৭০ কোটি ডলার বা সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ১০০ কোটি ডলার বা সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো : এ কে খান গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, টি কে গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, ইউনাইটেড গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, পিএইচপি গ্রুপ, প্রাণ গ্রুপ ও পারটেক্স গ্রুপ।
এ ছাড়া আরো ১০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের আয় সাড়ে চার হাজার কোটি থেকে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো : নোমান গ্রুপ, বিএসআরএম গ্রুপ, কেডিএস গ্রুপ, হা-মীম গ্রুপ, এসিআই গ্রুপ, ট্রান্সকম গ্রুপ, ভিয়েলাটেক্স গ্রুপ, প্যাসিফিক জিনস, কনফিডেন্স গ্রুপ ও ওয়ালটন গ্রুপ। বর্তমানে করোনার এ দুর্দিনেও একচেটিয়া ব্যবসা করছে দেশের টেলিযোগাযোগ বা মোবাইল অপারেটররা। পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদক, বিপণন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসাও বেশ ভালো। তাদের দিক থেকেও এ সময়ে সহায়তার কোনো তথ্য জানা যায়নি।
এনজিওগুলো দরিদ্র মানুষদের নিয়ে কাজ করলেও এই দুর্দিনে তাদের বেশির ভাগেরই বড় কোনো সহায়তার কথা জানা যায়নি। ব্র্যাক দুই দফায় প্রায় তিন লাখ অতিদরিদ্র মানুষকে ৩০ কোটি টাকার নগদ সহায়তা দিচ্ছে। প্রথম দফায় এক লাখ ৫৪ হাজার ৭৩৯ জনের প্রত্যেককে দুই সপ্তাহের জন্য তিন হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। এ কাজ করতে গিয়ে ব্র্যাক দেখতে পায় অতিদরিদ্রের সংখ্যার তুলনায় তা হচ্ছে না। পরে সংস্থাটি আরো ১৫ কোটি টাকা এ জন্য বরাদ্দ দিয়েছে।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ড. আসিফ সালেহ  বলেন, ‘ব্র্যাক একটি অলাভজনক বেসরকারি সংস্থা হিসেবে এই দুর্দিনে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সরকারের পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। আমরা স্বাস্থ্যগত সহায়তার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। আমরা দেখেছি লকডাউনের পর থেকে অসহায় মানুষের প্রায় ৭৫ শতাংশের আয় কমেছে। আর ১৪ শতাংশের বাসায় খাবার নেই। এ সংখ্যা এখন আরো অনেক বেশি।’ তিনি বলেন, শুধু সরকার আর দু-একটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বিপুল পরিমাণ অসহায় মানুষের সহায়তা করা কঠিন। যারা লাভজনক প্রতিষ্ঠান, সমাজের বিত্তশালী বা বড় বড় গ্রুপ আছে তাদের সময় এসেছে এগিয়ে আসার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এনজিওদের মধ্যে ব্র্যাক ছাড়াও আশা ১২ কোটি টাকার সহায়তা দিয়েছে। সাজিদা ফাউন্ডেশন কিছু কাজ করছে। দেশের অন্যতম শীর্ষ এনজিও গ্রামীণ ব্যাংক, আরডিআরএস, ব্যুরো বাংলাদেশসহ আরো যেসব বড় এনজিও রয়েছে, এ দুর্দিনে তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো আর্থিক সহায়তামূলক কার্যক্রমের খবর জানা যায়নি। গ্রামীণ ব্যাংকসহ দেড় ডজন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দিক থেকেও করোনার এ দুঃসময়ে বড় কোনো আর্থিক সহায়তা বা কার্যক্রম নিয়ে সরকারের পাশে দাঁড়ানোর খবর পাওয়া যায়নি।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, ‘এমন দুঃসময়ে সারা বিশ্বেই বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান তথা ব্যক্তি খাত এগিয়ে এসেছে। আমাদের এখানে শুধু সুবিধা নেওয়ার সময় দেখা যায়, দেওয়ার হাত কম। কয়েকটি গ্রুপকে দেখলাম তারা প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে তিন থেকে ১৫ কোটি টাকার অনুদান দিয়েছে। এটা পর্যাপ্ত নয়। এ যুদ্ধে একা সরকার লড়তে পারবে না। আমরা এখন যা দেখি তা হলো কিছু তরুণ, ছোট ছোট স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা খুবই সীমিত পরিসরে তাদের অবস্থান থেকে কাজ করে যাচ্ছে। আর বড়রা বড় হলেও তাদের সহায়তা ঐতিহ্যগতভাবে মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানায় কিছু অনুদানেই সীমাবদ্ধ। এখন সময় এসেছে নিজেদের সত্যিকারের সেরা মানের করপোরেট হিসেবে প্রমাণ করার। যারা শুধু আয় করবে না, দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকবে।’
জানা যায়, বিশ্বের শীর্ষ করপোরেট প্রতিষ্ঠান, শিল্প গ্রুপ, ধনী ব্যক্তিরাও করোনার এ আর্থিক মন্দা মোকাবেলায় নিজ নিজ দেশ, এমনকি অন্য গরিব দেশের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন। প্রাথমিকভাবে অনলাইন বাজার আমাজন পাঁচ মিলিয়ন ডলার সহায়তা ঘোষণা করেছে। মাইক্রোসফট, আলাস্কা এয়ারলাইনস, স্টারবাক আড়াই মিলিয়ন ডলার, ফেসবুক ২০ মিলিয়ন ডলার এবং অ্যাপল ১৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ উৎপাদক প্রতিষ্ঠান রোচি প্রতি সপ্তাহে চার লাখ মানুষের করোনা টেস্ট কিট দিচ্ছে ফ্রি।
গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ড, ডাইসন, জেনারেল মোটরস গাড়ির বদলে আপাতত জীবন বাঁচাতে ভেন্টিলেটর ও মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি বানিয়ে ফ্রিতে সরবরাহ করছে। ফ্রান্সের বিশ্বসেরা যন্ত্রপাতি ও প্রসাধনী সামগ্রী উৎপাদক ব্র্যান্ড এলভিএমএইচ মানুষকে সুরক্ষা দিতে এখন বানাচ্ছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার। আলিবাবা ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা সারা বিশ্বে ১১ লাখ করোনা টেস্ট কিট, ৬০ লাখ মাস্ক ও ৬০ হাজার পিপিই সরবরাহ করেছে ফ্রিতে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশকেও সহায়তা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্টিলারি, ওয়াইন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান স্যানিটাইজার উৎপাদনের উপকরণ ফ্রিতে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের পাশের দেশ ভারতের শীর্ষ গ্রুপের উদ্যোক্তারাও দেশের এ দুর্দিনে সাড়া দিয়েছেন। টাটা গ্রুপ একাই দেড় হাজার কোটি রুপি অর্থ সহায়তা দিয়েছে। দিয়াগু ইন্ডিয়া গ্রুপ তিন লাখ লিটার হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করে দিয়েছে। আরো পাঁচ লাখ স্যানিটাইজার, দেড় লাখ মাস্কসহ আরো অন্যান্য উপকরণ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে গ্রুপটির। বেদান্ত রিসোর্সের প্রধান নির্বাহী অনিল আগারওয়াল ১০০ কোটি রুপি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। রিলায়েন্স গ্রুপের মুকেশ আম্বানি পাঁচ কোটি রুপি সহায়তা ও মুম্বাইয়ে ১০০ শয্যা হাসপাতাল করে দিচ্ছেন। পাইথন গ্রুপের সিইও শেখর শর্মা করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থসেবা দিতে পাঁচ কোটি রুপি অনুদান দিয়েছেন। এ ছাড়া হিরো বাইসাইকেল ১০০ কোটি রুপির তহবিল, মাহিন্দ্র গ্রুপ ভেন্টিলেটর, গোদরেজ, হিন্দুস্তান ইউনিলিভার সাবান ও স্বাস্থ্যসেবা নিরাপত্তা সামগ্রীর দাম কমিয়ে দিয়েছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবীদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতেই হবে। যদিও বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকের সক্ষমতা রয়েছে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার। বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন যেমন এফবিসিসিআই, এমসিসিআই উদ্যোগ নিতে পারে। এ ছাড়া ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের নিজ নিজ কর্মীদের সহযোগিতা করে, তাহলেই অনেকাংশে সরকারের চাপ কমে যাবে।

 

মন্তব্য