বিশেষ খবর

সকালের সময় 'কোভিড-১৯' আপডেট
# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ 40321 7925 559
বিশ্ব 5,803,658 2,508,944 357,712

সম্মুখ যোদ্ধাদের যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে

বাংলাদেশে প্রথম দিকে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রবাসী বাংলাদেশী ও বিদেশিদের বিমানবন্দরে পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা ও সক্ষমতার চরম অভাব দেখা গেছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। তারপর নিয়োজিত মন্ত্রণালয়গুলো প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে অবহেলা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এছাড়া বিদেশ থেকে আসা বাংলাদেশিদের আশকোনা হজ্জ্ব ক্যাম্পে ১৪ দিন রাখার সিদ্ধান্তও চরম অব্যবস্থাপনার পরিচয়। কেননা সেখানে ঐ ধরনের পরিবেশ তৈরি করা হয় নি। এখানে না রেখে আরো উন্নত পরিবেশে রাখলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো না। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন অতি প্রয়োজনীয় ছিল। ঐ কাজে ব্যর্থ হয়ে হোমকোরান্টাইনে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু তাঁদের হোমকোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার তদারকিতে অবহেলা দেখা যায়।

আবার যারা বিদেশ ফেরত তাঁরা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে। তারা হোমকোয়ারেন্টাইন না মেনে ভ্রমণ, বিবাহ, আত্মীয়তায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এক অর্থে তারা সমগ্র দেশবাসীকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। তাঁদের আরো দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিল। কারণ এদেশে তাঁদের যেমন অবদান আছে, তেমনি দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্যও তাঁদের থাকা উচিত । তাঁদের আপনজনের কথা চিন্তা করে হলেও তাঁরা নিয়ম মেনে চলতে পারতো। যারা হোমকোয়ারেনটাইনে ছিল তাদের তালিকা করে, কঠোর নজরদারিতে রাখতে হতো, না মানলে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার ছিল। যে সমস্ত জেলায় প্রবাসী বেশি এসেছে, ঐসব জেলাগুলো লকডাউন করা উচিত ছিল। আমাদের দেশে তখন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ঐ সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণানালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু তারা তা জোরেশোরে করেনি। যখন টেস্ট করার কথা বলা হচ্ছে, তখন তাঁদের কিছুই নেই, শুধু মিথ্যা আশ্বাস। আমরা প্রস্তুত, কিন্তু দেখা গেল, আমরা মরার জন্য প্রস্তুত। যা কিছুদিন পর সত্য হলো। আমাদের সুযোগ ছিল, কিছু বিদেশ ফেরতদের নিয়ন্ত্রণ, কিছু জায়গা দ্রুত লকডাউন এবং করোনাভাইরাস আক্রান্তদের দ্রুত সনাক্ত করা। প্রচুর নিরাপত্তা সামগ্রী তৈরি এবং আমদানি করা। নিরাপত্তা সামগ্রী বিতরণ করা। স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে জড়িতদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সাহস যোগানো। এর ফলে আমরা দেশের মানুষকে নিরাপদ রাখতে পারতাম। আবার কিছু জেলা লকডাউন করে, অন্যান্য জায়গায় অর্থনৈতিক কাজকর্ম চালু রাখা উচিত ছিল । তা না করে সারা দেশ ঢিলেঢালা লকডাউন চলমান থাকলো। ফলে মানুষ কাজ হারালো, জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে গেল।
আবার দেশের ত্রাণ দান ও বিতরণে বিশৃঙ্খলা ও লুটপাট শুরু হলো। মানবিক সাহায্যের বিপরীতে অমানবিক কাজ শুরু করলো কিছু অমানুষ। প্রশাসনকে বাড়তি কাজ করতে হলো, যা খুবই দুঃখজনক। অন্যদিকে দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থায় আরেক অব্যবস্থাপনা শুরু হলো। সাধারণ রোগের চিকিৎসা দেয়া বন্ধ করে চিকিৎসকরা রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি ও কষ্ট বাড়িয়ে দিলো। অধিকাংশ ডাক্তার নিরাপত্তার কারণে চিকিৎসা না দিয়ে ঘরে বসে থাকলো। কিছু ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে থাকলো। করোনা নামক যুদ্ধের সম্মুখ যোদ্ধাদের (ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থকর্মী,হাসপাতালের পরিচ্ছন্নকর্মী,আম্বুলেন্স চালক ) জন্য মানসম্মত মাক্স, পিপি, টেস্ট কীট, সহ সুরক্ষা সামগ্রীর অভাব দেখা গেল। এই ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দানের এবং সমন্বয় হীনতা প্রকটভাবে দেখা গেল।
আবার যারা এই মহামারী করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তাঁদের সাথেই বাড়িমালিকদের অমানবিক আচরণ দেখলো দেশবাসী। তারা চিন্তা করলো না, এই সমস্ত মহান মানুষ তাদের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। স্বাস্থকর্মীদের নিরাপত্তা দেখে সাধারণ মানুষ বাস্তব অবস্থা বুঝতে পারলো। তাদের মনে ভয়-ভীতি সৃষ্টি হলো। আবার দেশের কিছু সুবিধাবাদী এবং শোষক শ্রেণি সাধারণ শ্রমিকদের প্রতি অমানবিক আচরণ শুরু করলো। শ্রমিকদের শুধুমাত্র উৎপাদন যন্ত্র মনে করলো। দুর্বল শ্রমিক শত মাইল পায়ে হেঁটে মনিবের আদেশ পালন করতে বাধ্য হলো। মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক যেন মনিব-দাসের মত। একটা রাষ্ট্রে মানুষের নিরাপত্তা দুই ভাবে চিন্তা করা হলো। তাঁদেরকে মালিক নামক মনিবের কাছে সম্পদ রক্ষায় পাঠানো হলো। কতোটা অমানবিক আচরণ! করোনাভাইরাস নামক মহামারী মোকাবেলায় যোদ্ধারা (ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থকর্মী, পুলিশ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আর্মি, পরিছন্নতাকর্মী, ঔষুধ শিল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ, কিছু মহান রাজনৈতিক নেতা-কর্মী) দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে দেশ ও মানুষকে নিরাপদ রাখতে চেষ্টা করলো। তাঁদের প্রচেষ্টা এখনো চলমান আছে। তবে এর মধ্যে কিছু ভন্ড মানুষের কৃষকদের সাথে প্রতারণা দেখলাম। কিছু ভালো মানুষের ধান কাটার উদ্যোগ ও চেষ্টার বদনাম হলো। একজন প্রধানমন্ত্রীর করোনাভাইরাস নামক মহামারী থেকে দেশের মানুষ এবং অর্থনীতি বাঁচানোর জন্য নানা উদ্যোগ এবং প্রাণপণে চেষ্টা দেখলাম। কিন্তু অনেক সুবিধাবাদী, স্বার্থপর এবং কাণ্ডজ্ঞানহীন, চাপাবাজ এবং অযোগ্য ব্যক্তির কারণে বারবার সিদ্ধান্তহীনতা। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কালক্ষেপণ হলো। অনেক সময় ও সুযোগ নষ্ট হলো। এর ফলে বাংলাদেশের মানুষের করোনা নামক ভাইরাস করুনা করেনি। 


যা সর্বনাশ হওয়ার হয়েছে। যেভাবে কিছুটা হলেও সমাধান হতে পারে বলে আমি মনে করি:
১) পরীক্ষাগার বাড়ানো, টেস্ট বিপুল সংখ্যক বৃদ্ধি করা এবং দ্রুত আক্রান্ত রোগী সনাক্ত করা। ২) সম্মুখ যোদ্ধাদের (ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থকর্মী, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী) যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা। যাতে করোনা ভাইরাস নামক যুদ্ধে বিজয় লাভ করা যায়। ৩) মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট সঠিক তথ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। কারণ সর্বোচ্চ জায়গায় সঠিক তথ্য না পৌছালে, সঠিক সিদ্ধান্ত আসে না। ৪) বেশি আক্রান্ত জায়গায় লকডাউন কঠোর করা (ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, ময়মনসিংহ)। ঢাকায় শুধুমাত্র প্রশাসনিক কাজ চালু রাখা। কম আক্রান্ত এলাকাগুলোয় অর্থনীতির স্বার্থে লকডাউন শিথিল করে উৎপাদন কাজ চালু রাখা। কেননা আমাদের মত দেশে দীর্ঘদিন সমগ্র দেশ লকডাউন করে টিকে থাকা সম্ভব না। ৫) সব মানুষের (শ্রমিক, শহরের গরীব কর্মহীন) স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সমানভাবে দেখা। ৬) কর্মজীবী মানুষের সাথে শিশু ও বয়স্কদের কম মিশতে দেওয়া। ৭) সরকারের পক্ষ হতে দেশের গরিব মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা। ৮) বিত্তবান দানশীল ব্যক্তিদের গোপনে আশেপাশের মানুষের উপকার করতে হবে। ভন্ড, ধান্ধাবাজ, প্রচারে বিশ্বাসীরা ত্রান বিতরণ হতে দূরে থাকবেন। আর ঐ ছবি ও প্রচারনা যদি ভালো উদ্দেশ্যে হয় আলাদা কথা। এই করোনা মহামারীতে পৃথিবীর অনেক দেশের সরকার ও দানশীল মানুষ ত্রান দেয়, কিন্তু ত্রাণ দানের ছবি তোলা হয় না। তাঁরা কী মানুষের সাহায্য ও ত্রান দেয় না? তবে যদি ঐ ছবি কিংবা প্রচারণা ভালো উদ্দেশ্যে হয় সেটা আলাদা কথা। ৯) বর্তমানে ও ভবিষ্যতে মানুষকে বাঁচাতে নিজের জায়গা থেকে আন্তরিকভাবে মানুষ ও সরকারকে সহযোগিতা করা। ১০) সকল সংস্থা ও ব্যক্তিকে সমালোচনা সহ্য করে সঠিক সিদ্ধান্ত ও কাজ করা। ১১) দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি করে ভিভিআইপি ও ভিআইপিদের দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া। তাহলে স্বাস্থ্য খাত ভবিষ্যতে বিভিন্ন রোগ মোকাবেলায় সক্ষম হবে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সঠিক অবস্থা তাঁরা বুঝতে পারবে।

লেখক: মো: ইকরামুল ইসলাম, সাবেক ছাত্র, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

মন্তব্য