সাহিত্য

সকালের সময় 'কোভিড-১৯' আপডেট
# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ 60391 12804 811
বিশ্ব 6,714,335 3,261,276 393,408

বিষন্ন পহেলা বৈশাখ

বাংলা নতুন বছর ১৪২৭ সালের প্রথম দিন, উদাসী এক বিষন্ন নীরবতায় ছেয়ে আছে চারপাশ তথা সমগ্র পৃথিবী। বৈশাখের প্রথম দিন কখনো এতটা নিরুত্তাপ, বিবর্ণ, স্তব্ধ আর শূন্যতায় কাটেনি আমার। জীবনে এমন বিষন্ন পহেলা বৈশাখ আসে নি আগে। গোটা পৃথিবী আজ চিন্তিত এবং অজানা আতংকে শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করছে। কোথাও আজ কেউ ভালো নেই। সবাই মনমরা, সবার মন খারাপ। নতুন বছরের প্রথম দিনের উচ্ছ্বাস নেই কারো মাঝে। করোনা ভাইরাস আতংকের কাছে নুয়ে পড়েছে মানুষ ও পৃথিবী। বৈশাখের প্রথম সকালে ঘুম ভেঙেই সৃষ্টিকর্তার কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করলাম, ১৪২৬ যেন আর ফিরে না আসে, ১৪২৭ বাংলা নতুন বছরের প্রথম প্রহরে ঘুচে যাক মানুষের সব কষ্ট ও অবরুদ্ধ থাকার দিন-রাত্রিগুলো। নতুন বছরের প্রথম দিনটিকে চিরায়ত আনন্দে বরণ করতে না পারার আক্ষেপে, বুকের ভেতরে তিরতিরে একটা দহন অনুভব করছিলাম। বোধ জ্ঞান হবার পর থেকে ইংরেজি নতুন বছর নিয়ে কোন মাতামাতি না থাকলেও, বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনটি বেশ  আনন্দ, উৎসবের মধ্য দিয়ে পালন করে এসেছি। অথচ এই বৈশাখে কোথাও কোন আনন্দ নেই, কাউকে নিমন্ত্রণ করতে পারিনি আমরা কেউ। সামনের বছর নিশ্চয়ই খুব সুন্দর হবে এই আশায় বুক বেঁধে, সম্পূর্ণ স্বভাব বিরুদ্ধ বিষণ্ণ বৈশাখের প্রথম প্রহরটি অতিবাহিত করছি। 

পুরো বিশ্ব একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা কেউ জানিনা এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবো কখন? কিভাব? দুশ্চিন্তা, হতাশা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। এমন অনিশ্চয়তায় কিছুই ভালো লাগে না। কোন কিছু কাছে টানে না। গৃহবন্দি মানুষের দৌড় জানালার কাছেও যেতে ইচ্ছে করেনা আজকাল। নিউইয়র্ক শহরের প্রকৃতিতে এখন বসন্তকাল চলছে। নাতিশীতোষ্ণ এমন আবহাওয়ায় ঘরে মন বেঁধে রাখা খুবি দুষ্কর। নীলাকাশ, বিস্তৃত প্রান্তরজুড়ে শূন্য পথঘাট এসব দেখলে বুকের ভেতর তেষ্টা জাগে। কতদিন হয়ে গেলো নীলাকাশের নিচে এই পথ ধরে আমি হাঁটি নি, অথচ এই পথের প্রতিটি ধূলিকণা আমাকে চেনে। আমার মত করে হয়ত এই পথ এবং পথের ধূলিকণারাও আমার স্পর্শ পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। মানুষের বুকজুড়ে জল ছাড়াও আরো কত রকমের তৃষ্ণা বয়ে চলে, তা শুধু ভুক্তভোগী জানে, অন্য কেউ জানেনা৷ শৃঙ্খল সবসময় কষ্টের। করোনা মানুষকে গৃহবন্দি করেছে। আমার বুকের তৃষ্ণা মুক্তির জন্য, মহামারী করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আত্মা রাতদিন ছটফট করে বেড়াচ্ছে। 

প্রবাদ আছে, নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। ঘরের বাইরে করোনার ভয়। আমার মত জগতের বেশীরভাগ মানুষের আপাতত নিঃশ্বাস নেয়ার জায়গা কক্ষ থেকে একটু দূরের ওই জানালা। অনেকদিন ধরে ভয়ে জানালাও খুলি না। বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনে জানালা খুলে দিতেই হুড়মুড়িয়ে স্নিগ্ধ বাতাস ঢুকে পড়ে গোটা ঘরজুড়ে। বাতাসের শরীরজুড়ে চেনা চেনা আপন গন্ধ ভাসে। মায়ের হাতের গরম ভাপ তোলা লাল চালের ভাতের ঘ্রাণ, বাবার হাতের কাঁচা আম, কাঁঠালের ঘ্রাণ, দাদীর হাতের দুধ -চিতইর ঘ্রাণ, দাদার হাতের গুড়- নারিকেল দিয়ে মুড়ি মাখানো ঘ্রাণ - আমি দিশেহারা! চোখ বন্ধ করে ঘ্রাণ নিচ্ছিলাম প্রাণভরে। আচমকা বোধ করি ঘ্রাণগুলো দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি যতই ঘ্রাণগুলোকে ধরে রাখতে চাইছি তারা ততই পিছলে যাচ্ছে। বড় ফাঁকা, শূন্য- শূন্য লাগে আমার। আপন, চেনা ঘ্রাণগুলোর মোহে এত বেশি আবেশিত হয়ে পড়েছিলাম যে বেরিয়ে আসতে পারছিলাম না। নিজের মনকে নিজেই প্রবোধ দিই, কত কত বছর আগের, কত কত হাজার মাইল দূরের, জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর ঘ্রাণ পাবো কোথা হতে! এগুলো আমার অবসর মস্তিষ্কের কল্পনা বৈকি আর কিছু না! বাবা-মা, দাদা-দাদি সহ অন্য আরো প্রিয় জনেরা হারিয়ে গেলেও, বছরের বিশেষ দিনগুলোতে কিংবা আমার একান্ত অবসরে তাঁদেরকে পাই আমি একান্ত অনুভবে। আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি তাঁদের বিচ্ছেদ বেদনায়, স্মৃতিভারে।

 বাতাসের চেনা গন্ধ আস্তে আস্তে কেটে যায়। স্মৃতির ঝড়ে ক্লান্ত হয়ে উঠি। একটু জিরোই। আজ বছরের প্রথম দিন, অবরুদ্ধ ঘরের কোণে ভীষণ মনে পড়ছে ফেলে আসা দিন, দেশ, আপন মানুষগুলোকে। বিষণ্ণ মনের আনাচ-কানাচ জুড়ে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মুহূর্তগুলো, শুকনো পাতার মতো বিরহের মর্মর সুর হয়ে বাজছে। 

জীবন খুবি ছোট। স্বপ্নের চেয়েও ছোট। জানিনা আগামীকাল ভোর দেখবো কিনা। অদৃশ্য এক অনুজীব করোনা ভাইরাসের আধিপত্যের কাছে সমর্পিত হয়ে কত কথা মনে উঁকিঝুঁকি মারছে রোজ। মানুষের হাতে যখন কাজ থাকে না তখন ভাবনার আধার হয় মস্তিষ্ক। না চাইলেও গৃহবন্দি জীবনে মাথাভর্তি হযবরল স্মৃতির মিছিলে বারবার হারিয়ে যাই। পৃথিবী ও মানুষের দুঃসময় চললেও, প্রকৃতির এখন সুসময় চলছে। ন্যাড়া গাছে সবুজ পাতা, ফুল ফুটেছে, গাছের ফাঁক ফোকরে পাখী ডাকছে, দিগন্তজুড়ে মিষ্টি রোদ খেলছে - এসব দেখলে মনেই হয় না পৃথিবীর গভীর অসুখ হয়েছে। উল্টো মনে হয় প্রকৃতির অংশ মানুষ বহুদিন পর মনোযোগের সঙ্গে প্রকৃতির রূপ দেখছে, দু'জনার সঙ্গে দু'জনার দেখা হয়েছে, প্রকৃতিকে অনুভব করছে। মানুষ ও প্রকৃতি তীব্র এক মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে মুক্তির পথেই হাঁটছে। সংকটে পড়ে মানুষ ও প্রকৃতি একে অন্যকে আঁকড়ে ধরেছে।  মানুষ তো প্রকৃতির-ই  অংশ। মানুষ ছাড়া প্রকৃতিকে নিষ্প্রাণ লাগে। 

মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে ভালো থাকতে পারে না। পহেলা বৈশাখ কাটছে কোয়ারেন্টিন কিংবা সঙ্গনিরোধ হয়ে। মানুষ আজ বাধ্য হয়ে বিচ্ছিন্ন থাকলেও, কেউ ভালো নেই কোথায়ও। 

আলস্যের প্রতি তীব্র টান থাকলেও এমন বন্দিজীবন কখনো কাম্য ছিলনা আমার, একলা থাকতে ভালোবাসলেও একাকীত্বে ডুবে যেতে চাইনি এখনকার মতো, কাজের চাপে ছুটি আরাধ্য মনে হলেই, বন্দি হয়ে এভাবে জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করতে চাইনি কখনো। চোখের সামনে যেন মস্ত বড় একটা তালা ঝুলছে। তালার এপাশে অন্ধকার, ওপাশে আলো। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে মানুষগুলো চাবি খুঁজছে হন্যে হয়ে, ওপাশে আলোতে যাওয়ার জন্য৷ কিন্তু মানুষগুলো তালার চাবি খুঁজে পাচ্ছে না। কেউ জানেনা তালার চাবি কোথায়? কতদূরে? আমি, আমরা সকলে অন্ধকার সাঁতরাচ্ছি চাবির খোঁজে। আশায় বুক বাঁধি, খুব দ্রুত কেউ চাবি খুঁজে পাবেন, তালা খুলে দিবেন এবং আমরা এসব অবরুদ্ধ দিনশেষে আলোর দিনে ফিরে যাব। ফুল, পাখী, প্রকৃতির সঙ্গে রোজ ভোরে মানুষও জেগে উঠবে পূর্ণ প্রাণের উদ্যমে। থমকে পড়া চরাচর প্রাণ ফিরে পাবে মানুষের কোলাহলে। করোনা ভাইরাসকে পরাজিত করে ধূসর রঙের বিষন্ন বৈশাখ অচিরেই মুক্তোর মত জ্বলে উঠবে মানুষের হৃদয়ে। 

সময় কভু থেমে থাকে না। নিস্তব্ধ দুপুর পেরিয়ে ইতিমধ্যেই  বৈশাখের প্রথম দিন ঢলে পড়েছে গোধুলির বুকে। করোনা আক্রান্ত পৃথিবী দিনের বেলায়ও বেঘোরে ঘুমোচ্ছে রাতের মতো করে। কিছুতে মন বসাতে না পেরে জানালা থেকে সরে এসে বিছানায় গিয়ে বসলাম বই হাতে। আধা ঘন্টা ধরে বইএর এক পাতা বারবার পড়েও, কি পড়েছি মনে করতে না পেরে বই রেখে দিলাম দূরে। 

এমতাবস্থায়, হঠাৎ মনের আয়নায় ভেসে উঠলো আমার রসায়ন বিজ্ঞানের প্রফেসর, দিলশাদ জেসমিন রুমা আপার মুখ খানি। আমার দুই রুম পরেই ছিল রুমা আপার রুম। হোস্টেল ভর্তি অসংখ্য মেয়েদের ভীড়ে, উনি খুব স্নেহ করতেন আমাকে। তাঁর রুমমেট অর্থনীতির শিক্ষিকা নাসিমা আপা ছুটিতে গেলে, রুমা আপা রাতে আমাকে তাঁর সঙ্গে ঘুমাতে বলতেন। তখন আপা অনেক গল্প বলতেন আমাকে। গল্পচ্ছলে একদিন বলেছিলেন, মন খারাপ হলে আয়নার সামনে বসে যত্ন করে সাজবে, নিজেকে সময় নিয়ে দেখবে, নিজের সঙ্গে নিজে প্রাণ খুলে কথা বলবে, হাসবে, দেখবে মন ভালো হয়ে যাবে। মন খারাপের এই সময়ে মন ভালো করার জন্যই রুমা আপার কথা মনে পড়লো! 

যেমন চিন্তা তেমন কাজ! জীবনের অনেক পথ পেরিয়ে এসে মনের বনে কিশোরী বেলার দুরন্তপনা জেগে উঠে আপনমনে । জীবনের এমন দুর্দিনে একটু ভালো থাকাটাই মূখ্য হয়ে উঠেছে। উদাসী নীরব বিকেলের শরীর বেয়ে নিঝুম সন্ধ্যা নামে। ডিম লাইটের আলোতে আমার প্রিয় রঙ, হালকা গোলাপি রঙের শাড়ী জড়িয়ে আয়নার সামনে গিয়ে বসি। ছোটবেলার মত করে লাল ফিতায় চুল বাঁধি, রঙিন কাগজ দিয়ে হাতপাখা বানাই, অতি প্রিয় বেলি ফুলের সুগন্ধ মাখি, কপালে কাজল দিয়ে টিপ আঁকি - সাজসজ্জা শেষে আয়োজন করে আয়নায় সামনে বসে নিজেকে দেখবো, নিজের সঙ্গে কথা বলবো, ঠিক এমন সময় কালবৈশাখী ঝড়ের মত গর্জন তুলে, সাইরেন বাজিয়ে, আমার ঘরের জানালার পাশ ঘেঁষে চলে যায় এম্বুলেন্স। আমি ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকি। আয়নায় আমি নিজেকে কুয়াশাজড়ানো ঝাপ্সা একটা অচেনা বিন্দুর মত দেখতে পাই। রুমের ডিম লাইট নিভিয়ে দিয়ে অন্ধকারে বসে থাকি। নাহ, কিছুতেই মন ভালো হলো না। গোটা পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষগুলো যখন বিষন্ন তখন গৃহকোণে একাকী কোন কিছুতেই মন হেসে উঠে না। অন্ধকারে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকা আমার বিস্ফোরিত চোখ দু'টো অপেক্ষায় থাকে একটি আলোকিত সকালের। যে সকালে বর্তমান সময়ের সমস্ত ক্ষত, অসুখ সেরে মানুষ ও প্রকৃতি নিশ্চিন্তে বাঁচবে, হেসে উঠবে।  

মন্তব্য