সাহিত্য

সকালের সময় 'কোভিড-১৯' আপডেট
# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ 186894 98317 2391
বিশ্ব 11,763,959 6,758,048 541,228

কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে

ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ একটি দূর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতিবছর ঘূর্নিঝড়, বন্যা, খড়া ও নানান রকম প্রাকৃতিক দূর্যোগ লেগেই থাকে। এর ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়। আর দেশের সকল পর্যায়ের কৃষকরাই এই ক্ষয় ক্ষতির মূল ভুক্তভোগী। চারমাসযাবত করোনার ছোবলে বিপর্যস্ত জনজীবন। অর্থনীতির চাকা চালু রাখতে সীমিত পরিসরে লকডাউন ব্যবস্থাকে শিথিল করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি করোনার কারণে দেশে খাদ্য সংকট যাতে দেখা না দেয়, সেজন্য সরকার যথেষ্ট সচেতন। আর এই খাদ্য সংকট দূরীকরণে কৃষির বিকল্প নেই। এজন্য বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগও হাতে নিয়েছে সরকার। প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে।

দেশের যেকোন সংকটে কৃষিই শেষ ভরসা হিসেবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। গ্রামে মানুষের মুখে মুখে একটা কথা প্রায়ই লক্ষ করা যায়, "পেট ঠিক তো সব ঠিক "। আসলেই তাই, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে আর বাঁধা থাকে না। করোনার কারণে লকডাউন থাকায়, কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে প্রান্তিক কৃষক। গণপরিবহন, রেল যোগাযোগ, নৌপরিবহন বন্ধ থাকায় কৃষিজাত পন্যের ক্ষতি হয়েছে। পরবর্তীতে ঘূর্নিঝড় আম্পানের কারণে দেশের দক্ষিণ -পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। কৃষকদের ফসল বিনষ্ট হয়েছে। বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় মাছ চাষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন হয়েছে। করোনা যেতে না যেতেই চলে এসেছে আগাম বন্যা। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাইয়ের শেষ নাগাদ বন্যার পানি আসার কথা থাকলেও, এ বছর আরও আগেই পানি বন্দী হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। বন্যার পানিতে ভেসে গিয়েছে ঘর বাড়ি, ফসলি জমি, মাছের খামার। আম্পানের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই আরেক দূর্যোগ। 'এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'। ইতিমধ্যে অধিকাংশ কৃষক আমন ধানের বীজতলা তৈরি করেছে, পাটের কিছু অংশ কাটতে পেরেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্যার পানি জমে থাকায়, বীজতলা নষ্ট হয়েছে, পঁচে গিয়েছে পাট। উচু জায়গার অভাবে গবাদি পশু রাখার সংকট দেখা দিয়েছে। একের পর এক দূর্ভোগে কৃষকগণ দিশেহারা । সরকার থেকে ত্রাণ তৎপরতা জোরদার থাকলেও বস্তুতপক্ষে দেশের প্রান্তিক কৃষক সমাজ কমই লাভবান হয়। গ্রাম্য পর্যায়ে কৃষকদের জন্য সার, বীজসহ নানান রকম কৃষি যন্ত্রপাতি দেয়া হলেও, আদোতে যারা প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষী, যারা এসব প্রণোদনা পাওয়ার দাবীদার, তারা দিনের পর দিন বঞ্চিত হয়। মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে সুসম্পর্ক না থাকা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নেতৃত্বের অভাব, কৃষি সম্পৃক্ত বিষয়ে অজ্ঞতা, উচ্চ মূল্যে ঋণ, ফসলি জমি কম থাকাসহ বিভিন্ন কারণে কৃষকদের ভোগান্তি লেগেই রয়েছে।

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি কৃষি, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা ও তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর দাঁড়ানো । কিন্তু দেশের উন্নতি সাধনে কৃষির বিকল্প নেই। জাতির খাদ্য চাহিদা মেটাতে, অপুষ্টির হাত থেকে রক্ষা করতে কৃষি ও কৃষকের ভূমিকা অসামান্য। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, কেবল কৃষি ব্যবস্থার উন্নতির ফলে। কিন্তু করোনা ও প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতির এখন বেহাল দশা। নীতিনির্ধারকদের এই বিষয়ে অধিক গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। আমাদের কৃষকরা ধানের মৌসুমে সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্য মূল্য পান না, কম দামে বিক্রি করে তারা ঋণ পরিশোধ করেন। মিল মালিকেরা মধ্য থেকে লাভবান হোন। শাক সবজির সময়ে পরিবহন সমস্যার কারণে কম দামে বিক্রি করতে হয়। কৃষকদের সমস্যাগুলো তুলে ধরার কেউ নেই। তাদের বড় বড় সংগঠন নেই। নেই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। করোনার সময়েও সবাই ঘরবন্দী থাকলেও, কৃষকের সে সাহস নেই। তাকে যে দুমুঠো খেতে হবে। ফসল ফলাতে হবে। ফসল মাঠে রাখলে বন্যা কিংবা প্রাকৃতিক দূর্যোগে বিনষ্ট হবে। সত্যিকার অর্থে দেশের প্রকৃত যোদ্ধা এরাই, যাদের পরিশ্রমের জন্যই আমরা পেট ভরে খেতে পাই। দেশের সিংহভাগ কৃষক মূলধন সংকটে। কৃষিতে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও নতুন জাত সংযুক্ত হওয়ায়, মূলধন বেড়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষক মিল মালিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যসত্ত্বভোগীদের কাছে থেকে বিভিন্ন শর্তে ঋণ নিচ্ছে। ফলে সরকার কতৃক দাম নির্ধারণ করে দেয়া হলেও তাদের শর্তের মার প্যাচে পরে বাধ্য হয়ে কম মূল্যে ফসল বিক্রি করতে হয়েছে। করোনার সময়ে সকল পর্যায়ের চাকুরীজীবি বেতন, বোনাস পেলেও, কৃষক কিছুই পাচ্ছে না। বরং তাকে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য ফসল ফলাতে হয়। কৃষকদের এই দুর্দিনে রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের মত কৃষি খাতেও তহবিল ষোষণা করতে হবে।

কৃষি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাই কৃষক ও সরকারের সাথে নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে থাকে। কৃষি ও মাঠ ফসল সংক্রান্ত যেকোন সমস্যা ও সমাধানে তারাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে । টেকসই ও গতিশীল কৃষক সংগঠন গড়তে মাঠ পর্যায়ে কৃষি প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সরবরাহ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সত্যিকার অর্থে এতে কৃষক লাভবান হলেও, কৃষকদের ব্যক্তিগত দক্ষতা কমই বৃদ্ধি পায়। বরং কিছু সুবিধাবাদী এই উদ্যোগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আসছে। কৃষকদের উপকরণ হস্তান্তরের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা না করে, কিভাবে দক্ষতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশীদার করা যায়, সেদিকে সরকারসহ মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের সচেতন হতে হবে। টেকসই ও গতিশীল কৃষক সংগঠন তৈরি করতে হলে, মাঠ কর্মীদের দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের একত্রীত করতে হলে, তাদের দিয়ে সংগঠন করতে চাইলে, একই সমস্যাভুক্ত কৃষকদের আগে শনাক্ত করতে হয়। তারপর তাদের মাধ্যমেই সমস্যা চিহ্নিত ও মাঠ কর্মীদের সহযোগীতায় সমাধান করা হয়। এজন্য পি.অার.এ. অর্থাৎ পার্টিসিপেটরি রুরাল অ্যাপরাইজাল মডেল শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ সমীক্ষা সমশ্রেণির কৃষক চিহ্নিতকরণ, সমস্যা নিরুপণ ও সমাধানে কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে।

একটার পর একটা দূর্যোগ কবলিত হয়ে সীমাহীন কষ্টে জর্জরিত থেকে দিনযাপন করছে তাঁরা। সাধারণত প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের কৃষকরা শুধু কৃষি কাজ করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের আর কেনো অায়ের উৎস নেই৷ দূর্যোগের কবল থেকে ফসল রক্ষা তো দূরে থাক, বন্যার পানিতে ঘড়- বাড়ি হারিয়ে রাত্রিযাপনই এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকরা দেশের চালিকাশক্তি। এদের রক্ত পানি করা পরিশ্রমের ফলেই দেশ আজ উন্নতির পথে এগোচ্ছে। তবুও কষ্টার্জিত ফসল চলে যায় মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের কাছে। অবহেলা ও নানান বঞ্চনার স্বীকার হয়েও দেশের সকল ক্রান্তিকালে কৃষকরাই হয়েছে শেষ ভরসা। কৃষি খাতে ভর্তুকি ও বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো, স্বল্প সুদে ঋণ দেয়া হলেও, কৃষকরা এর থেকে কতটুকু লাভবান হবে তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। পূর্বের ন্যায় মধ্যসত্ত্বভোগীদের দৌঁড় ঝাপ কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে তাও ভাববার বিষয়। শতবর্ষীয় ডেল্টা প্লান বাস্তবায়নে কৃষকদের অবদান অনস্বীকার্য। কৃষকরা দেশের অন্নদাতা। এদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কৃষি মন্ত্রনালয়ের সাথে সকল মন্ত্রনালয়ের সমন্বয় করে, পরিকল্পিত রুপরেখা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। অন্যথায় দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধির পথকে আরও বেগবান করতে এসকল সমস্যাই অন্তরায় হিসেবে পরিলক্ষিত হবে।

মন্তব্য