বিশেষ খবর

সকালের সময় 'কোভিড-১৯' আপডেট
# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ 707,362 597,214 10,081
বিশ্ব 139,771,067 118,808,535 3,001,702
Manarat University

চাকরির পরীক্ষায় স্ত্রীর হয়ে প্রক্সি

দুর্নীতির বরপুত্র বরিশাল ডিপিএইচইর ক্যাশিয়ার আশরাফ

বেতন মাত্র ২০ হাজার টাকা অথচ মাসিক ব্যয় লাখ টাকার উপরে। জরুরি প্রয়োজনে চলাচল করেন বিমানে। কিছুদিন পরপর বদলান মোটরসাইকেলের মডেল। নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (মেডিকেল, সফটওয়্যার, ইলেকট্রনিক, সুপারসপ, চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, কাপড় ও বিউটি পার্লার)। বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে একাধিক অ্যাকাউন্ট। স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদারকে নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে নিয়ন্ত্রণ করছেন বরিশাল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) ঠিকাদারি। শুধু তাই নয়, ব্যক্তি জীবনে রয়েছে আভিজাত্যের ছাপ। বাইকের মডেল পাল্টানোর মতো সংসার জীবনেও করেছেন দুই বিয়ে। সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের টিউবওয়েল মেকানিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্ত্রীর হয়ে বোরকা পরে প্রক্সি দিতে গিয়ে ধরা পড়ে সাসপেন্ডও হয়েছেন।

না, কোনো কর্মকর্তার কথা বলছি না! বলছি বরিশাল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ক্যাশিয়ার মো. আশরাফ আলীর কথা। আর এ সবকিছুই করেছেন তার বস বরিশাল জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুল হাসানের আশীর্বাদে। তিনিও গড়েছেন শতকোটি টাকার সম্পদ। সরকারের নেয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গুরু-শিষ্য মিলে বরিশাল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির আখড়া হিসেবে। আর এতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন প্রকৃত ঠিকাদাররা।

তাদের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে এর আগে একাধিকবার সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে জানালেও প্রতিকার পাননি সাধারণ ঠিকাদাররা। সম্প্রতি ডিপিএইচই নলকূপ মেকানিক পদে দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রক্সি পরীক্ষা দিতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়েন ক্যাশিয়ার আশরাফ আলী। এরপরই নড়েচড়ে বসে কর্তৃপক্ষ। তাৎক্ষণিকভাবে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে এনে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে প্রথমে তাকে বরিশাল থেকে সরিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বদলির আদেশ দেয়। এরপর তাকে সাসপেন্ড (সাময়িকভাবে নিস্ক্রিয়) করা হয়। তবে এখনো নিজ দায়িত্বে বহাল রয়েছে আশরাফের পৃষ্ঠপোষক নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুল হাসান।

কে এই আশরাফ?

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আশরাফ আলীর বাবা ছিলেন ডিপিএইচইর সাবেক প্রধান প্রকোশলী মো. মনিরুজ্জামানের গাড়িচালক। সেই সুবাদে এই কর্মকর্তা তার দুই ছেলেকে (আশরাফ ও মাইনুদ্দিন) চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। চাকরি পাওয়ার পর তাদের চোখ এখন আকাশপানে। ঘুষ ছাড়া চাকরি পেলেও এই দুই ভাই ঘুষ ছাড়া এখন কোনো কাজ করেন না। ক্যাশিয়ার পদে চাকরিরত অবস্থায় বসের সাথে যোগসাজশে আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন আশরাফ। নিজ জেলা ভোলায় গড়ে তুলেছেন একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আশরাফের আয়ের প্রধান উৎস ঠিকাদারি। অন্যের লাইসেন্সের মাধ্যমে নিজেই ঠিকাদারি করেন। নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুল হাসানের মাধ্যমে তার পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়ে দুজনেই হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। অনিয়মকে নিয়ম বানিয়ে ও সরকারি বিধিনিষেধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছে গুরু-শিষ্যর সার্বিক কার্যক্রম।

জানা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ভোলায় জাল অভিজ্ঞতার সনদ দিয়ে পাঁচ কোটি টাকা ও পিরোজপুরের নাজিরপুরে সাড়ে তিন কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেন এই দুই সহচর। এছাড়া বরিশালে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার কাজ আশরাফ নিজেই পরিচালনা করছেন।

আরো অভিযোগ রয়েছে, করোনাকালীন সাধারণ মানুষের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং অন্যান্য সামগ্রীও বিক্রি করে দিয়েছেন এবং মিটিং, সেমিনার ও বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতের খরচ দেখিয়ে নগদ অর্থ তুলে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। নিজেই যেহেতু ক্যাশিয়ার, তাই কাজটি করতে তার জন্য আরো সহজ হয়েছে।

আশরাফের সম্পদের বিবরণী : নিজ জেলা ভোলায় রয়েছে মোহনা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড হসপিটাল (পার্টনারশিপ ব্যবসা)। এই প্রতিষ্ঠানটির কাগজপত্র তার প্রথম স্ত্রী খালেদা আক্তার উর্মীর নামে করা। উক্ত প্রতিষ্ঠানে ডিএমডি হিসেবে সপ্তাহে দুদিন দায়িত্ব পালন করেন আশরাফ, যা সরকারি নিয়মবহির্ভূত। এছাড়াও খালেদা আক্তারের নামে রয়েছে ভোলার বাংলায় স্কুল মোড়ে মারওয়া সুপারশপ, জিএসপি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট এবং উকিলপাড়ায় সাফওয়া ইলেকট্রনিক্স। এখানেই শেষ নয়, আছে দ্বিতীয় স্ত্রী আমেনার নামেও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রয়েছে বরিশাল কাকলির মোড়ে ওমেন্স বিউটি পার্লার এবং কাপড়ের ব্যবসা। বরিশাল শহরে দুই স্ত্রীকে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় আলিশনা বাসা ভাড়া করে রাখছেন। ঘরের ভেতরে রয়েছে নামিদামি ব্র্যান্ডের ফার্নিচার। তৃতীয় শ্রেণির একজন কর্মকর্তার এমন বিলাসি জীবনযাপন দেখলে যে কেউ আঁতকে উঠবে। প্রতি মাসে তার সংসার খরচ লাখ টাকার উপরে।

অভিযোগ আছে, আশরাফের দ্বিতীয় স্ত্রীর (ইসলামী ব্যাংক এবং ডাচ্ বাংলা ব্যাংক) অ্যাকাউন্টে রয়েছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকা। এছাড়াও সিটি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকসহ পাঁচটি ব্যাংকে রয়েছে তার নিজস্ব অ্যাকাউন্ট। রয়েছে দুই স্ত্রীর প্রায় ১৫ থেকে ২০ ভরি স্বর্ণ।

এছাড়া বরিশালের নামিদামি হোটেলে নারী নিয়ে রাতযাপন করারও অভিযোগ রয়েছে তার নামে। ফেব্রুয়ারি মাসে হোটেলে এক নারী নিয়ে স্থানীয়দের হাতে ধরাও পড়েন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করেন।

এদিকে বরিশাল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুল হাসান অফিস প্রধান হলেও আশরাফের সাথে রয়েছে তার বিশেষ সংখ্য। বন্ধুর মতো চলাফেরা করতেন দুজন। অফিসের বাইরেও বিভিন্ন জায়গায় তাদের একসাথে ঘোরাফেরার ছবি ফেসবুকে দেখা গেছে। বসের সাথে বিশেষ সম্পর্ক থাকার কারণে প্রায় সময় ছুটি না নিয়েই নিজ কর্মস্থলে সময় দিতেন আশরাফ। বসকে খুশি রাখতে তার ব্যক্তগিত কাজও করে দিতেন।

এদিকে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়াসহ জাল সনদ প্রদান ও অভিযোগের পাহাড় রয়েছে মইনুল হাসানের বিরুদ্ধে। তারও অনিয়মের ফিরিস্তি তুলে ধরে একাধিকবার এর প্রতিকার চাইলে কোনো সমাধান দেয়নি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কর্তৃপক্ষ। এছাড়া মইনুল হাসান নির্বাহী প্রকৌশলী বরিশালের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন দুর্নীতি করে আসছেন। ফলে তিনি কয়েক বছরে কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।

বরিশালের স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, মইনুল ঠিকাদারদের সাথে যা-তা ব্যবহার করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, তিনি প্রায় রাতে তার সরকারি অফিসকক্ষে আসর বসান এবং তিনি নিজ অফিসের স্টাফদের সাথে পান থেকে চুন খসলেই অকথ্যভাষায় গালিগালাজ করেন। তিনি সম্পূর্ণ সেচ্ছাচারি ব্যবহার করেন। কোন ধরনের আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে পছন্দের ঠিকাদারদের ৯ থকে ১০ শতাংশ ঊর্ধ্বদরে কাজ পাইয়ে দিতে ব্যবস্থা করে দেন। নিজেও করে আসছেন ঠিকাদারি ব্যবসা। তার এসব ব্যবসার অন্যতম সহযোগী অফিস স্টাফ ক্যাশিয়ার আশরাফ। তার মাধ্যমেই তিনি ঠিকাদারি কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

এদিকে, গত ২৭ মার্চ খিলগাঁও মডেল কলেজে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মেকানিক পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে পরিক্ষার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন আশরাফ ও তার স্ত্রী।

জানা গেছে, পরীক্ষার দিন কৌশলে স্ত্রীর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন আশরাফ। তিনি নিজেকে অধিদপ্তরের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে পরীক্ষা হলে প্রবেশ করেন এবং স্ত্রীর পাশে বসেন। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের সন্দেহ হলে তাকে উপস্থিত সকলের সামনে ধরে ফেলেন। ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-সচিব মো. সাঈদ-উর-রহমান উপস্থিত হলে তার সাথে তর্কবিতর্ক করেন এবং অসৌজন্যমূলক আচরণ করলে তাকে পুলিশ হেফাজতে দেয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষায় তাকে পুলিশ হেফাজতে না দিয়ে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয় ডিপিএইচই কর্তৃপক্ষ। তার এরূপ আচরণের কারণে ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে বলে জানান অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী।

এখানেও প্রতারণার আশ্রয় নেন আশরাফ আলী। নিয়োগ কমিটির তথ্য অনুযায়ী মেকানিক পদে নিয়োগের জন্য আশরাফ আবেদনে জন্ম তারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৯০ উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বরিশাল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর হতে প্রাপ্ত চাকরি তথ্য মোতাবেক তার জন্ম তারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৮৮। সে অনুযায়ী আবেদনে তথ্য জালিয়াতি করেছেন আশরাফ আলী, যা ভয়াবহ অপরাধ। তাকে বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে আবেদন করতে হবে। কিন্তু দেখা যায়, নিয়োগ কমিটির নিকট দাখিলকৃত তথ্য অনুযায়ী আশরাফ বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে আবেদন করেননি। মেকানিক পদের জন্য আবেদনের বিষয়টি বরিশাল ডিপিএইচই অবগত নয়।

এদিকে আশরাফের বর্তমান ক্যাশিয়ার পদটি ১৬ গ্রেডের। কিন্তু তিনি ১৭ গ্রেডের টিউবওয়েল মেকানিক পদে আবেদন করেন। উপরের পদে থেকে কেন নিচের পদে তিনি চাকরির আবেদন করেছেন তার কারণ জানতে চেয়েছে কর্তৃপক্ষ।

এই বিষয়ে আশরাফ আলী বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সত্য নয়। আমি পরীক্ষা হলে যাইনি এবং পরীক্ষাও দেইনি। স্যার (প্রধান প্রকৌশলী) মানুষের কথা শুনে আমার চাকরি নিয়ে টানাটানি করছেন।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমান বলেন, আশরাফ ও মইনুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত চলছে। আশরাফের কাছে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত বক্তব্য দাখিলের জন্য বলা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সেদিন পরীক্ষার হলে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, যা আমাদের প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইতোমধ্যে অভিযুক্ত আশরাফ আলীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এছাড়া মন্ত্রণালয় থেকে তার বিষয়ে আরো তদন্ত চলছে এবং প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থ্য নেয়া হবে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না বলেও জানান সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী।

মন্তব্য