বিশেষ খবর

সকালের সময় 'কোভিড-১৯' আপডেট
# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ 707,362 597,214 10,081
বিশ্ব 139,771,067 118,808,535 3,001,702
Manarat University

মাদকাসক্তদের রক্তের ব্যবসা রমরমা

রাজধানীর সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর চারপাশসহ ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে মানুষের রক্তের দোকান। এসব রক্তের দোকানের ব্যবসায়ীরা অপেশাদার, ভয়ানক রোগে আক্রান্ত এবং হেরোইন, ফেনসিডিল, আফিমসহ বিভিন্ন মাদকসক্ত ব্যক্তিদের মাদকের বিনিময়ে রক্ত সংগ্রহ করছেন। 
শুধু তাই নয়, ব্লাড ব্যাংকগুলোতে পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ, টেকনিক্যাল সুপারভাইজার, ল্যাব সহকারী, নার্স ও যন্ত্রপাতি ও রোগের পরিক্ষার ব্যবস্থাও নেই। মাদকাসক্তদের সংগ্রহকৃত রক্তের কোন প্রকার পরিক্ষা নীরিক্ষা ছাড়াই এক শ্রেনীর কথিত চিকিৎসকদের সহযোগিতায় বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগিদের শরীরে ব্যবহার করা হচ্ছে। নগরীর মিটফোর্ড হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের চার পাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ব্লাডব্যাংক। 
এর মধ্যে চাঁনখার পুল এলাকার ডোনার ব্লাড এন্ড প্যাথলীজ সেন্টার, লাইফ সেভ ব্লাড ব্যাংক এন্ড ট্রান্সফিউশন ও মেডিসিন লাইফ সেভ ডায়াগনষ্টিক, বকশী বাজার রোডে ঢাকা ব্লাড সেন্টার, শ্যামলীর ফেমাস ব্লাড সাপ্লাইয়ার ছাড়া নগরীর বিভিন্ন ব্লাড সেন্টারসহ বিভিন্ন ব্লাডব্যাংকে সরেজমিনের খোঁজ নিয়ে মাদকাশক্ত ব্যক্তিদের রক্ত সংগ্রহ করার তথ্য পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, দেশের নামী-দামি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কতিপয় ডাক্তার ও নার্সরা এসব মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের রক্ত সংগ্রহ করে দোকান খুলে ব্যবসা করছেন। এসব রক্ত ব্যবসায়ীরা জানান, তারা সরকারের নিয়ম মোতাবেক রক্ত সংগ্রহ ও ব্যবসা করে আসছেন। 
আবার আনন্দবাজার এলাকায় লাইফ সেভ ব্লাড ব্যাংক এন্ড ট্রান্সমিফউশন নামক ব্লাডব্যাংক রয়েছে। সেখানকার এক ব্যক্তি জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে মিটফোর্ড হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক ট্রান্সফিউশনের একজন চিকিৎসক কর্তৃক পরিক্ষা-নিরীক্ষার করার পর রক্তগুলো বিক্রি করা হয়ে থাকে।
সূত্র জানায়, নগরীর বিভিন্ন পার্ক ও মাদক স্পটের পাশে গোপনীয় রক্ত সংগ্রহের দোকান খোলা হয়েছে। এসব দোকানে মাদকাসক্তদের দেহ থেকে নিয়মিত রক্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে।  প্রশাসনের কতিপয় সদস্য তাদের কাছ থেকে নিয়মিত সপ্তাহ আদায় করছেন। আবার বাংলামটর এলাকায় একটি ব্লাডব্যাংক রয়েছে। পান্থকুঞ্জ পার্কে থাকা এক মাদকাসক্ত জানান, তারা ব্লাড ব্যাংকে রক্ত দেওয়ার পর তাদেরকে ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত হাতে ধরিয়ে দেয়। তিনি বলেন, আমরা মানবতার জন্য মানুষ বাঁচানোর জন্য রক্ত দেই। আমার রক্তের বিনিময়ে আরেকটি প্রাণ জীবন পায়। দেশ স্বাধীন করার জন্য মা-বোনেরা রক্ত দিয়েছেন। তাই আমরাও রোগীদের রক্ত প্রদান করে আসছি। আমাদের রক্তের জন্য তেমন কোন টাকা নেই না। শরীরে শক্তি বাড়াতে শুধু মাত্র দুধ খাওয়ার জন্যই দোকানের মালিক সামান্য কিছু টাকা দেন। তবে তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা রক্তের ব্যাগ ১ হাজার টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হয় বলে বিভিন্ন হাসপাতালের দালালদের সূত্রে জানা গেছে। 
এ সব রক্তে হেপাইটিস বিসি ও ই এবং এইচ আই ভি এইডসের ভাইরাসসহ মরণ ব্যধি ভাইরাস যুক্ত রক্তদাতারা রক্ত দিচ্ছে। অনেকেই আবার নেশার টাকার জন্য অনেকেই রক্ত বিক্রি করছে। 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব রক্তের ১০০ ভাগই দূষিত। আবার সরকারী, বেসরকারী চিকিৎসকরা রোগির আত্মীয়দের রক্ত ক্রয়ে বাহির থেকে বাধ্য করছেন। রোগির আত্মীয়দের রোগির দেহে দূষিত রক্ত পুশ করতে বাধ্য করছেন। আর এর বিনিময়ে তারা নিদিষ্ট অংকের একটি কমিশন পেয়ে থাকেন বলে জানা গেছে। প্রাইভেটর ক্লিনিকে মাদকাসক্তদের রক্ত ক্রয় করা হয়ে থাকে। পরে তা দালালের মাধ্যমে ওই সব হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগিদের দেহে পুশ করা হয়। নগরীর বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে ভেজাল বিরোধী অভিযানে মাঝে মধ্যেই মাদকাসক্ত রক্ত উদ্ধারসহ অনেককে গ্রেফতার ও জরিমানা করা হয়েছে। তারপরও রক্ত ব্যবসায়ীদের অবৈধ ব্যবসা থামছেই না। এসব রক্ত রোগীদের দেহে পুশ করা হলে তা হবে অত্যন্ত বিপদজনক বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। পেশাদার রক্তের ডোনার বা রক্তদাতাদের মধ্যে ২৯ শতাংশ ব্যক্তি হেপাটাইটিস বিসি ও ই রয়েছে। আর ৫০ শতাংশ ব্যক্তির এইডসের জীবানু রয়েছে। 
জানা গেছে, সারাদেশে প্রাইভেট ব্লাড ব্যাংক রয়েছে অর্ধশত। তাছাড়া নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিককে ঘিরে ব্যাঙের ছাতার মতো অলিগলিতে শতশত ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। রোগির দেহে রক্ত দেওয়ার আগে ৫টি মরণ ব্যধি হেপাটাইটিস বিসি, এইচআইভি ও এইডস, ম্যালেরিয়া ও সিফলিস পরীক্ষার নিয়ম রয়েছে। আর ব্লাড ব্যাংকগুলোতে পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ, টেকনিক্যাল সুপারভাইজার, ল্যাব সহকারী, নার্স ও যন্ত্রপাতি ও রোগের পরিক্ষার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অথচ ৯৮ ভাগ ব্লাড ব্যাংকে এ সবের কিছুই থাকে না। 
গত ২০১০ সালে র‌্যাবের ভেজাল বিরোধী অভিযানের সময় নগরীর ২১টি ব্লাড ব্যাংকে অভিযান চালিয়ে ৪২ ব্যক্তিকে গ্রেফতার ও ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে। আর ২০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়। আর ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে এক চিকিৎসককে ৯০ টাকা থেকে ১২০ টাকা ব্যাগ রক্ত মাদকাসক্তদের কাছ থেকে ক্রয় করার সময় হাতে নামে গ্রেফতার হন। ওই চিকিৎসক ৫০০ টাকা শেকে ১২০০ টাকায় তা বিক্রি করতেন।
এ ব্যাপারে ঢামেক হাসপাতালের দায়িত্বরত একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের এক শ্রেনীর দালালের মাধ্যমেই এসব ব্লাড ব্যাংক পরিচালিত হয়ে আসছে। আর তাদের সংগ্রহকৃত ব্লাড হাসপাতালের রোগিদের স্বজনদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে অভিযান চালানো হলেও কয়েকদিন পরই আবার ব্যবসা শুরু করে।

 

মন্তব্য