বিশেষ খবর

সকালের সময় 'কোভিড-১৯' আপডেট
# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ 707,362 597,214 10,081
বিশ্ব 139,771,067 118,808,535 3,001,702
Manarat University

লাশ সিদ্ধ করে কঙ্কাল তৈরি, কারখানার খোঁজে গোয়েন্দারা

মরা মানুষের লাশ সিদ্ধ করে কঙ্কাল তৈরি ও ব্যবসা চলছেই। এই চক্রটি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ওষুধের মার্কেটগুলোর দেয়ালে দেয়ালে লিফলেট সাঁটিয়ে কঙ্কাল বিক্রি করছে। অমানবিক এই কঙ্কাল প্রস্তুতকারক, তাদের কারখানা ও ব্যবসার সংঙ্গে জড়িতদের সন্ধানে গোয়েন্দারা মাঠে নেমেছেন।  রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে কঙ্কাল তৈরি ও ব্যবসার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে

সূত্র জানায়, আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সদস্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য, জুরাইন কবরস্থানের লোকজনসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কবরস্থানের লাশ চুরির সঙ্গে জড়িতদের সহযোগিতায় মরা মানুষের লাশ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তা কেমিক্যাল দিয়ে প্যাকেটজাত করে ফ্ল্যাট বাড়ি বা নিরাপদ জায়গায় নিয়ে পানিতে সিদ্ধ করে কঙ্কাল তৈরি করা হচ্ছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ছাত্রনেতাদের মাধ্যমে প্রকাশ্যে লিফলেট টাঙিয়ে সেই কঙ্কালগুলো বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী, মর্গের লোকজন, মিটফোর্ড ও শাহবাগ এবং বিএমএ মার্কেটে ক্রেতা পরিচয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও মর্গ, হাসপাতাল এলাকায় গিয়ে দেয়ালে দেয়ালে কঙ্কাল বিক্রির লিফলেট সাঁটানো দেখা গেছে। পোস্টারে লেখা রয়েছে ‘কঙ্কাল বিক্রয় হবে’। দাম ২৮ হাজার টাকা থেকে ৩৬ হাজার টাকা। সেখানে বিক্রেতার মোবাইল নম্বর দেয়া আছে। আবার আরেকজন একটি পোস্টারে লিখেছেন, ‘ফ্রেস ফুল সেট বোন্স বিক্রয় করা হবে’। সেখানে মোবাইল নম্বর দেয়া রয়েছে। ওই মোবাইল ফোনে ক্রেতা পরিচয়ে কথা বলা হলে তিনি জানান, ভালো কোয়ালিটির বোন্স নিতে হলে বেশি টাকা দিতে হবে। আর টাকাগুলো বিকাশে পরিশোধের পর নিদিষ্ট ঠিকানায় কঙ্কাল পৌঁছানো হবে বলে জানানো হয়। 
ঢামেক মর্গ সূত্র জানায়, মানুষের লাশ সিদ্ধ করে কঙ্কাল তৈরি সিন্ডিকেটে ঢামেক কতিপয় ছাত্রনেতা, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের কতিপয় চিকিৎসক ছাড়াও বিভিন্ন মর্গে দায়িত্বরত কর্মচারী, বিভিন্ন করস্থানের দায়িত্বরতরা মিলে কঙ্কাল তৈরি ও ব্যবসা করে আসছে। প্রতিটি কঙ্কাল তৈরির জন্য ছয় থেকে আট হাজার টাকা খরচ হয়। আর তা ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। আবার এসব কঙ্কাল কোনো মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী যদি কিনে এক বছর ব্যবহার করার পর তিনি আবার একই দামে বিক্রি করতে পারবেন। এর আগে গত ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর রাজধানীর কাফরুল থানার পুলিশ ওই থানাধীন পূর্ব কাজীপাড়া ১৮৩/১ নম্বরের ১/এ নম্বর ফ্ল্যাটের দ্বিতীয় তলায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে মো. কামরুজ্জামান ওরফে নুর ও মো. শাহীন মিয়া নামে দুইজনকে আটক করে। তাদের ফ্ল্যাটবাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে মরা মানুষের ৩২টি মাথার খুলি, ৮০টি মানুষের হাতের কনুই, ৫২টি ফিবুলা, ১৩২টি রেডিয়াস আলনা, ৬০টি ক্লাবিকল বা গলার নিচের হাড়, ৬৪টি ফিমান, ৮০টি টিবিয়া, ৯৫টি হিপবন, ৪৭টি রিব, ২৪টি স্যাকরাম, আট কেজি মেরুদণ্ডের হাড়, ৪৫টি পাজরের হাড়সহ বিপুল পরিমাণ কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। আর কঙ্কাল তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম, কেমিক্যাল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় কাফরুল থানার তৎকালীন এসআই ফেরদৌস আহম্মদ বাদি হয়ে মামলা করেন। ওই মামলায় গ্রেফতারকৃতদের দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়।
ওই মামলাটি পরে তদন্ত করেন কাফরুল থানার তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টার (নিরস্ত্র) মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি তদন্ত শেষে আদালতে ২০১৭ সালের ৩মার্চ চূড়ান্ত রিপোর্ট বা চার্জশিট দাখিল করেন। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, মামলার এজাহার নামীয় আসামি কামরুজ্জামান ওরফে নুর, মো. শাহীন মিয়া ও পলাতক আসামি তন্ময় যোগসাজশে মানুষের দেহের মাথার খুলি, কঙ্কাল, ও মানব দেহের বিভিন্ন অস্থি ক্রয়-বিক্রয় করার জন্য নিজেদের দখলে রেখেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামি মো. কামরুজ্জামান ওরফে নুর, ও মো. শাহীন মিয়ার বিরুদ্ধে ২১৬ নম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সূত্র জানায়, ওই মামলার পলাতক আসামি তন্ময় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের তৎকালীন ইন্টার্নি চিকিৎসক ছিলেন। গ্রেফতারকৃতরা আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে পূণরায় একই ব্যবসায় নিয়োজিত হয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। আর তাদের বিষয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থা তদন্তে মাঠে নেমেছেন। রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় একটি কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। ওই জায়গাটি গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে রয়েছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সেই চক্রটি দেশের বিভিন্ন কবরস্থান থেকে লাশ চুরি করে অ্যাম্বুলেন্স বা লাশের গাড়িতে ঢাকায় আনা হয়। এরপর নিরাপদ জায়গায় নিয়ে ১০০ ডিগ্রিফারেনহাইট তাপমাত্রায় বড় হিটারে লাশগুলো সিদ্ধ করে। পরে কেমিক্যাল দিয়ে লাশের মাংস ও হাড় পৃথক করে তা শুকিয়ে কঙ্কাল তৈরি করা হচ্ছে। এরপর বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও ওষুধের মার্কেটে হাতে লেখা মোবাইল নম্বরসহ কাগজ টাঙিয়ে দেয়া হয়। নিখোঁজ, গুম, বেওয়ারিশ ও কবর থেকে চুরি হওয়া লাশ সিদ্ধ করে কঙ্কাল তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হয়।
দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, মর্গ, ওষুধে,অপরাধ বিজ্ঞানী, আইনজীবী এবং মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, এটা অর্গানাইজ ক্রাইম, মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ না থাকার কারণেই এ অপরাধ হচ্ছে। মানুষ মারা যাওয়ার পরও তার লাশ চুরির পর সিদ্ধ করে কঙ্কাল তৈরি ও ব্যবসা করা ঘৃণিত কাজ। এর সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ বিভিন্ন ধরণের লোক অর্থনৈতিক কারণে জড়িয়ে পড়েছে। এ ধরণের অপরাধের পর আর কোনো অপরাধ পৃথিবীতে আছে কি না তা তাদের সন্দেহ রয়েছে।

 

মন্তব্য