সাহিত্য

সকালের সময় 'কোভিড-১৯' আপডেট
# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ 707,362 597,214 10,081
বিশ্ব 139,771,067 118,808,535 3,001,702
Manarat University

কবি আজিজুর রহমান

কুষ্টিয়া জেলার চিরপরিচিত, চিরজাগরুক একটি নাম কবি আজিজুর রহমান। তিনি সকলের মাঝে ‘এই শহরের জীবন্ত কবি’ কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের শাখা-প্রশাখায় সমভাবে তার বিচরণ। তিনি নানামুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি একাধারে কবি, গীতিকার, অনুবাদকও সাংবাদিক ছিলেন। অনেক সংগ্রামও ত্যাগের মধ্যদিয়ে তাকে জীবন অতিবাহিত করতে হয়েছিল। কবি আজিজুর রহমান ১৯১৪ সালের ১৮ই অক্টোম্বর কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নদীর কোল ঘেঁষে ছুটে বেড়ানো ছোট্র ছেলেটি সময়ের আবর্তে একদিন পরিণত হলো বাংলা সাহিত্যের বড় মাপের ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মহাপুরুষ। তিনি মাত্র তেরো বছর বয়সে তার পিতাকে হারান। শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। চুকে যায় লেখাপড়ার পাঠ। ফিরে যেতে পারেন না প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায়, কিন্ত তাতে তিনি থেমে থাকেননি। তিনি ঘরে বসে বহুবিষয়ক বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করে স্বশিক্ষিত হয়েছিলেন। সেই সময় তিনি একটি নাট্যদল গড়ে তোলেন যেটি মঞ্চস্থ হতো শিলাইদহের ঠাকুর বাড়িতে। নাট্যদলটি কুষ্টিয়া জেলায় সেই সময়ে অনেক নাম করেছিলো। এই নাট্যদলে অভিনয় করতেন সেই সময়ের বিখ্যাত অভিনেতাগণ। তার মধ্যে ধীরেন দত্ত, উপেশ ঠাকুরের নাম উল্লেখযোগ্য। ১৯৩৪ সালে কবি হাটশ হরিপুরে চাদ স্মৃতি পাঠাগার গড়ে তোলেন। সেই সময় অনেক দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতো এই পাঠাগারে বই পড়তে। তিনি একাধারে ৩০০এর উপরে কবিতা রচনা করেছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য কবিতা ‘বুড়িগঙ্গার তীরে, পহেলা আষাড়, নৈশ নগরী, ফুটপাত, ঢাকাই রজনী, মুয়াজ্জিন ইত্যাদি। তার লেখা কবিতা সেই সময়ে নিয়মিত প্রকাশিত হতো আনন্দ বাজার, নবশক্তি, সওগাত, নবযুগ, শনিবারের চিঠি ইত্যাদি পত্রিকায়। কবি (১৯৬৪-১৯৭০) সাল পর্য়ন্ত দৈনিক পয়গম ও অধুনালুপ্ত পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। এছাড়াও ঢাকা থেকে প্রকাশিত কিশোর মাসিক ও আলাপনীর সম্পাদক ও তিনি ছিলেন। কবি ফররুখ আহমেদ তাকে ঢাকা বেতারে নিয়ে যান। তিনি ১৯৫৪ সালে ঢাকা বেতারে গীতিকার হিসেবে অনুমোদন পান। তিনি তিন হাজার গান রচনা করেছিলেন। কবি সেসময় ফররুখ আহমেদের সহায়তায় বিভিন্ন কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সাথে পরিচিত হন। কবি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঢাকা বেতারে চাকুরী করেন। কবিতা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও গান রচনার মধ্যদিয়েই তিনি সফলতার চূড়ায় আরোহন করেছিলেন। ঢাকার প্রখ্যাত সুরকাররা তার গানে সুর দিয়েছিলেন এবং শিল্পীরাও তার গান গেয়েছিলেন। চলচ্চিত্রের জন্য তিনি অসংখ্য গান রচনা করেছিলেন। যেমন- রাজধানীর বুকে, হারানো দিন, আগন্তুক ইত্যাদি। তার জনপ্রিয় গানগুলো হলো- আকাশের ওই মিটি মিটি তারার সাথে কইবো কথা, আমি রুপ নগরের রাজকন্যা রুপের যাদু এনেছি, কারো মনে দিওনা আঘাত, ভবের এই নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায় ইত্যাদি। তার অনুবাদ গ্রন্থগুলো হলো-ডাইনোসরের রাজ্যে (১৯৬২), জীব-জন্তুর কথা (১৯৬২) ইত্যাদি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থপঞ্জি-আজাদীর বীর সেনানি, পাঁচ মেশালি গানের সংকলন ইত্যাদি। দেশাত্মবোধক নিজস্ব গানের সংকলন-এই মন, ছুটির দিনে ইত্যাদি।
ছাত্র থাকা অবস্থায় কবি মুসলিম ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, এছাড়া ও তিনি প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সদস্য মনোনিত হয়েছিলেন। সততা, বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্বের কারণেই তিনি কুষ্টিয়া হাটশ হরিপুর ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, নদীয়া ফুড কমিটির সেক্রেটারী, কুষ্টিয়ার জেলা বোর্ড ও ডিস্ট্রিক এ্যডভাইজারী কমিটির সদস্যের পদ অলংকৃত করেছিলেন। তিনিই প্রথম কুষ্টিয়া জেলার ইতিহাস রচনায় হাত দিয়েছিলেন। অনেক কষ্ট করে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে তিনি কুষ্টিয়ার ইতিহাস সংগ্রহ করেছিলেন কিন্ত দুর্ভাগ্যক্রমে শেষ করে যেতে পারেননি। তিনি ১৯৭৮ সালে শারিরীকভাবে প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। অর্থাভাবে চিকিৎসা তার ভাগ্যে জোটেনি। অনেক অভিমান বুকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে কবি লিখলেন- ‘পৃথিবীর এই পান্থশালায় হায় পথ ভোলা কবি’। তিনি ১২ই সেপ্টেম্বর ঢাকার পিজি হাসপাতালে মৃত্যবরণ করেন। কুষ্টিয়াতে তার নামে একটি সড়ক হয়, যেটির নাম -‘কবি আজিজুর রহমান সড়ক’। বেঁচে থাকতে তিনি যে সন্মান পাননি তার মৃত্যুর পর সেই সন্মানে তিনি ভূষিত হয়েছিলেন। তাকে ১৯৭৯ সালে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সন্মান ‘একুশে পদক’ প্রদান করা হয়। 
জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে তার অনেক কষ্টে। কৈশোর থেকে শুরু হওয়া যন্ত্রণার বোঝা তিনি আমৃত্যু বহন করেছেন। দুঃখ তার পিছু ছাড়েনি। তিনি অনেক যন্ত্রণা ও কষ্ট বুকের গহীনে ধারণ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন তাকে স্মরণ করবে পৃথিবীবাসী। বাংলা সাহিত্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন তার কবিতাও গানের মধ্যদিয়ে। বাংলা সাহিত্যে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি কুষ্টিয়াবাসীর জন্য অহংকার ও গৌরবের।

 

মন্তব্য