ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

৪% অভিযোগ আমলে নিয়েছে দুদক


সাজেদা হক       photo সাজেদা হক
প্রকাশিত: ২৪-১-২০২৩ দুপুর ১১:১২

সাত উৎস  থেকে জমা ১৯ হাজার ৩৩৮ অভিযোগ
আমলে নেওয়া হয়েছে ৯০১টি
মোট অভিযোগের ৬১ ভাগ জমা দিয়েছেন সাধারণ মানুষ
ইকবাল মাহমুদের দেয়া সব দায়মুক্তির রেকর্ডপত্র হাইকোর্টে তলব 


দেশে দুর্নীতি দমনে কাজ করা একমাত্র আইনি প্রতিষ্ঠান দুদক। দুর্নীতির প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই সংস্থার দ্বারস্থ হন। দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে পাওয়া পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে সাত উৎস থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে জমা পড়েছে ১৯ হাজার ৩৩৮টি অভিযোগ। ১৯ হাজার ৩৩৮টি অভিযোগ থেকে অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেওয়া হয়েছে মাত্র ৯০১টি। নথিভুক্ত করা হয়েছে ১৫ হাজার ২৮৫টি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে ৩ হাজার ১৫২টি অভিযোগের নথি। এ হিসাবে প্রাপ্ত মোট অভিযোগের শতকরা ৯৬ ভাগই অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেয়নি দুদক।

এর মধ্যে সর্বোচ্চসংখ্যক ১১ হাজার ৭৯৬টি অভিযোগ দুদকের সেগুনবাগিচার প্রধান কার্যালয়ে জমা দেয় মানুষ। এছাড়া সরকারি দপ্তর ও সংস্থা থেকে ৯৬৭টি, বেসরকারি সংস্থা ও দপ্তর থেকে ৩৮৭টি, গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশিত প্রতিবেদন ১ হাজার ৩৫৪টি, দুদকের বিভাগীয় কার্যালয়ে ১ হাজার ৫৪৭টি, হটলাইন ও এনফোর্সমেন্ট বিভাগে ৫৮০টি এবং আদালত, ই-মেইল, ফেসবুকসহ অন্যান্য সোর্স থেকে আসে আরও ২ হাজার ৭০৭টি অভিযোগ। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মোট অভিযোগের ৬১ ভাগ জমা দিয়েছেন সাধারণ মানুষ।

কমিশনের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের নিজস্ব কর্মকর্তারা যেসব অভিযোগ অনুসন্ধান করে থাকেন, সেগুলোকে আমলে নেওয়া বলা হয়। দুদকের অভিযোগ পর্যবেক্ষণ, যাচাই-বাছাই, অনুসন্ধান ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যেসব মানুষ অভিযোগ জমা দেন, তারা সংস্থাটির তফশিলভুক্ত অপরাধের বিষয়ে সচেতন নন। অনেকে অভিযোগ লেখার ক্ষেত্রেও ভুল করেন। অনেক অভিযোগের কোনো ভিত্তি থাকে না। অনেকেই শত্রুতাবশত অভিযোগ জমা দিয়ে থাকেন। আবার অনেকেই তফশিলভুক্ত অপরাধের বিষয়ে জানালেও শুধু অভিযোগ লেখার ধরন ঠিক না হওয়ার কারণে তা আমলে নেওয়া যায় না।
অভিযোগের পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দিচ্ছে-দুর্নীতি দমনে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নানা হুঁশিয়ারি, হুমকি-ধমকি কাজে আসছে না। দেশের মানুষকে যাঁতাকলের মতো চেপে ধরেছে দুর্নীতির দুষ্টচক্র।

কমিশন আইনে তফশিলভুক্ত অপরাধের মধ্যে রয়েছে-সরকারি দায়িত্ব পালনকালে সরকারি কর্মচারী, ব্যাংকারসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত যে কোনো ব্যক্তির উৎকোচ (ঘুস), উপঢৌকন নেওয়া। সরকারি কর্মচারীদের নামে-বেনামে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করা। সরকারি অর্থসম্পদ আত্মসাৎ ও ক্ষতিসাধন, সরকারি কর্মচারীর উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা। সরকারি কর্মচারী কর্তৃক জ্ঞাতসারে কোনো অপরাধীকে শাস্তি  থেকে রক্ষার প্রচেষ্টা, কোনো ব্যক্তির ক্ষতিসাধনকল্পে সরকারি কর্মচারী কর্তৃক আইন অমান্য করা।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর অধীন সংঘটিত অপরাধগুলো এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক জালজালিয়াতি ও প্রতারণা। এসব অপরাধের বিষয়ে কমিশনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ, ই-মেইল, হটলাইন-১০৬-এ টোল ফ্রি টেলিফোনের মাধ্যমে যে কেউ অভিযোগ করতে পারেন।

এছাড়াও লিখিতভাবে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার বরাবর দুদক প্রধান কার্যালয়-১ ঢাকার ঠিকানা এবং আট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক বরাবর সংশ্লিষ্ট বিভাগের অধীন সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ জমা দেওয়া যায়। অথবা কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক বরাবর সংশ্লিষ্ট সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের অধীন সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ জমা নেওয়া হয়।

এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তৎকালিন চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ অবসরে যাওয়ার শেষ ৫ মাসে যাদের দায়মুক্তি দিয়ে গেছেন, সে সবের রেকর্ডপত্র তলব করেছেন হাইকোর্ট। রোববার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ এ আদেশ দেন। 

২০২১ সালের ১৬ মার্চ বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। একইসঙ্গে ‘দায়মুক্তি’ দিয়ে থাকলে কেন তা দেয়া হয়েছে, তাদের নাম, ঠিকানাসহ তালিকা ওইবছর ১১ এপ্রিলের মধ্যে দুদককে দাখিল করতে বলা হয়েছিলো। এরই ধারাবাহিকতায় রুলের শুনানি হয়। শুনানি শেষে দায়মুক্তি পাওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধান সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র তলব করেন।

২০২১ সালে বিদায়ের আগে দুর্নীতির বহু রাঘব বোয়ালকে ছেড়ে দেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। তাদের দায়মুক্তি আড়াল করতে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন কিছু নিরীহ ও দুর্বল ব্যক্তিকে। সব মিলিয়ে শেষ ৫ মাসে তিনি ২ শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি (দায়মুক্তি) দেন তিনি।

২০২০ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই শতাধিক দুর্নীতির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলো সত্যিকারার্থে কোনো অনুসন্ধান হয়নি। ‘নথিভুক্তি’ কিংবা ‘অনুসন্ধান পরিসমাপ্তি’র নেপথ্যে রয়েছে কোটি কোটি টাকার লেনদেন। এ দুর্নীতিকে আড়াল করতেই একদিকে ধামরাই বালিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অবসরপ্রাপ্ত এমএলএসএস মো. দীন ইসলাম ভুইয়াকে (প্রধান কার্যালয়ের নথি নং-০০.০১.২৬০০.৬১৩.০১.০২০.১৯) ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে (ঢাকার নথি নং-০০.০১.০০০০.৫০২.০১.০১৪.১৯) টেন্ডার-জালিয়াতির মাধ্যমে চীনা কোম্পানিকে আড়াইশ কোটি টাকার কার্যাদেশ প্রদানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরকেও। ‘অভিযোগ পরিসমাপ্তি’ সংক্রান্ত বেশিরভাগ নথিতে স্বাক্ষর করেন তৎকালিন মহাপরিচালক (বিশেষ অনু তদন্ত ১) সাঈদ মাহবুব খান।

অন্যদিকে, দুদক আইনে মিথ্যা অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে শত্রুতার কারণে বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অনেকে কমিশনে অভিযোগ জমা দিয়ে থাকেন, যা পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাইকালেই ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। ফলে এ ধরনের অভিযোগ শুরুতেই বাতিলের খাতায় চলে যায়। তবে এর আগেই পরিকল্পিতভাবে কৌশলে দুদকে অভিযোগের বিষয়টি রং মিশিয়ে প্রচার করে দেওয়া হয়, যা নিরাপরাধ ওই ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অভিযোগকারীকে শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। আইনে এ বিধানটি যুক্ত করার দাবি জানান তারা।

বিশ্বব্যাপী দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ প্রকাশিত ধারণা সূচকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, টানা তিনবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের উচিত আপন-পর বিচার না করে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। এটা করা সম্ভব হলেই দুর্নীতি কমবে, একই সঙ্গে এর মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ পাচারও বন্ধ হবে। তাতে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরবে দ্রুত।ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার চেয়ে অভিযোগ জমা পড়ে বেশি। আবার অনেক অভিযোগ জমা পড়ে যেগুলো দুদকের এখতিয়ারভুক্ত নয় এটা সত্য।

কিন্তু কোন বিবেচনায়, কোন মাপকাঠিতে প্রাপ্ত অভিযোগের বিষয়ে তিন ক্যাটাগরিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে দিলে কোনো প্রশ্ন থাকবে না। সবার কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে। অভিযোগকারীরা প্রতিকার না পেলে কিংবা কেন তার অভিযোগ আমলে নেওয়া হলো না, তা জানতে না পারলে দুদকের কাজের স্বচ্ছতা সম্পর্কে মানুষের ধারণা নষ্ট হবে। আর যেসব অভিযোগ তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয়, দপ্তর-অধিদপ্তরে পাঠানো হয়, সেগুলো সম্পর্কে দুদকের গুরুত্ব সহকারে ফলোআপ করা উচিত।

দুর্নীতি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে দুদককে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহারের অভিযোগ আছে। সংস্থাটি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার তুলনামূলক কম ক্ষমতাশালীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে যতটা সরব, ততটাই নীরব প্রভাবশালীদের ব্যাপারে। বিশেষ করে সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও ক্ষমতাসীন দলের অসৎ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও বিদেশে বাড়ি-গাড়ি করার অভিযোগ থাকলে দুদক এদের ব্যাপারে অনুসন্ধানে আগ্রহী নয়। এদের অনেকের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে তথ্যভিত্তিক সচিত্র প্রতিবেদনও প্রচার-প্রকাশিত হয়েছে। এরপরও তাদের দুর্নীতির অনুসন্ধানে আগ্রহী নয় দুদক। এসব অভিযোগের বেশির ভাগই পরিকল্পিতভাবে আমলে নেওয়া হয় না। যেগুলো আমলে নেওয়া হয়, সেগুলোরও বেশির ভাগ অনুসন্ধান পর্যায়েই নথিভুক্ত করা হয়। রেহাই পেয়ে যান দুর্নীতিবাজরা।

এমএসএম / এমএসএম