বেসিক ব্যাংকের শাখা প্রধানের সহযোগিতায় জালিয়াতি

ওয়ারিশানদের বাড়ি বন্ধক রেখে ঋণের টাকা আত্মসাত

news paper

আব্দুল লতিফ রানা

প্রকাশিত: ৭-৬-২০২৩ বিকাল ৫:২৭

20Views

 রাজধানীর পুরান ঢাকার ‘বেসিক ব্যাংক’ বাবুবাজার শাখার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সহেযাগিতায় ভুয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন জাকির হোসেন রনি নামের এক প্রতারক। 

শুধু তাই নয়, জাকির হোসেন রনির গর্ভধারিণী মা মোর্শেদা বেগম ওহাব, ছোট ভাই মো. মনির হোসেন রাজু, ছোট বোন আফরোজা ওহাব ও ফারহানা ওহাবদের সম্পত্তি উক্ত ব্যাংকে বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ঋণের বিষয়টি গোপন রাখা হলেও উক্ত ঋণের টাকা পরিশোধ করা হয়নি। আর বাবুবাজার শাখার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ উক্ত টাকা আদায়ে তেমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। সম্প্রতি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঋণের জন্য বন্ধক রাখা উক্ত সম্পত্তির ওয়ারিশান অর্থাৎ জাকির হোসেন রনির মা মোর্শেদা বেগম ওহাব, তার ছেলে মো. মনির হোসেন রাজু, তার ছোট বোন আফরোজা ওহাব ও ফারহানা ওহাবের নামে ঋণ পরিশোধের নোটিশ প্রেরণ করা হয়। এরপরই তাদের পরিবারের কাছে জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার ঘটনাটি ফাঁস হয়। পরে তারা জানতে পারেন যে, প্রতারক জাকির হোসেন রনি ৭৩৫৭ নম্বর দলিল মূলে মোট ২৫ লাখ টাকা এবং ১০৫৫৭ নম্বরের দলিল মূলে ১০ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও তা পরিশোধ না করায় এখন সুদ আসলে প্রায় কোটি টাকা ঋণ হয়েছে বলে ভুক্তভোগি মোর্শেদা বেগম ওহাব জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, পুরান ঢাকার ২-৩০ নম্বর কোতোয়ালী থানার জুমরাইল লেনস্থ ‘মেসার্স আলিফ লাম মিম কেমিক্যাল’ ও ‘আলিফ লাম মিম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের দোকানগুলোর স্বত্বাধিকারী দাবিদার জাকির হোসেন রনি। তিনি তার উক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের নামে পুরান ঢাকার বাবু বাজার বেসিক ব্যাংক শাখায় ঋণের জন্য আবেদন করেন। এরপর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ উক্ত ঋণ বরাদ্দ দেন। আর ঋণ বরাদ্দ পাওয়ার পর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক উক্ত দোকানগুলো বন্ধ করে দেন। অপরদিকে প্রতারক জাকির হোসেন মূলত ব্যবসার জন্য ঋণ গ্রহণ করলেও তিনি উক্ত টাকা দিয়ে নিজের নামে জমি এবং বাড়ি করেছেন। অথচ উক্ত ঋণের টাকা পরিশোধ না করায় মাত্রাতিরিক্তভাবে ঋণের টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। 

ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির বিষয়টি সন্ধানে জানা গেছে, পুরান ঢাকার ত্রাস জাকির হোসেন ওরফে রনি’র একক মালিকানাধীন ‘আলিফ লাম মিম কেমিক্যাল’ ও ‘আলিফ লাম মিম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বেসিক ব্যাংক বাবুবাজার শাখায় ঋণ পেতে আবেদন করেন। এরপর গত ২০০৬ এবং ২০০৭ সালে মোট ৩৫ লক্ষ টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। ব্যাংকের সাথে চুক্তি মোতাবেক উক্ত ব্যাংক ঋণগুলো গত ২০০৮ সালে পরিশোধ করার শর্ত থাকলেও ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত সেই ঋণের টাকা পরিশোধ করা হয়। ফলে সুদ আসলে এখন সেই ব্যাংক ঋণের পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ৩ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানায়, প্রতারক জাকির হোসেন রনি তার পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তিগুলো জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে প্রথমে যৌথ ওয়ারিশদের সাথে প্রতারিত করেন। এরপর পুরান ঢাকার নয়াবাজারস্থ ‘বেসিক ব্যাংক’ ব্যাংকের কাছে পিতার নামের জমি নিজ ব্যবসার উন্নয়নের জন্য ভুয়া কেমিক্যালের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করে তা বন্ধক রাখেন। উক্ত জাকির হোসেন রনির মা, ভাই-বোনদের ঋণের বিষয়ে কোন প্রকার তথ্য না জানিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তা কোনরূপ নোটিশ ব্যতিরেকেই ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে নেন। অথচ জাকির হোসেন রনি’র স্ত্রীর নামে ঋণ থাকলেও তা তিনি পরিশোধ করেছেন বলে জানা গেছে। 

প্রতারক জাকির হোসেন রনির ওয়ারিশগণ বা তার মা, ছোট ভাই, বোনেরা ব্যাংক ঋণের বিষয়ে ব্যাংকের নোটিশ পাওয়ার পরই বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর তথ্য অধিকার আইনে গত ২০১৯ সালের ২এপ্রিল বেসিক ব্যাংক প্রধান শাখাসহ কর্তৃপক্ষের কাছে ঋণের বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত তাদেরকে কোন প্রকার তথ্য দেননি বলে অভিযোগে জানা গেছে। এছাড়া ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে আইনী নোটিশ প্রদান করা হয়। কিন্তু সেই আইনী নোটিশের কোন জবাব বা বক্তব্য প্রদান করা হয়নি।

এ বিষয়ে ‘ব্যাসিক বাংক’ বাবুবাজার শাখা প্রধান এর ল্যান্ড ফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি ‘দৈনিক সকালের সময়’ কে জানান, ব্যাংকের কোন তথ্য তৃতীয় কোন পক্ষকে আমাদের দেওয়া নিষেধ আছে। আপনার যদি আমাদের শাখার কোন তথ্য প্রয়োজন হয়, তাহলে তথ্য অধিকার আইনে আমাদের প্রধান শাখায় আবেদন করবেন। আর সেখান থেকে কোন তথ্য চাইলে আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তথ্য দিতে বাধ্য।

উল্লেখ্য, পুরান ঢাকার বাবু বাজারের জাকির হোসেন ওরফে রনি’র বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। শুধু তাই নয়, তার পিতার নামের লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি তার মা মোর্শেদা বেগম ওয়াব, ছোট ভাই মো. মনির হোসেন রাজু ও দুই বোনসহ ওয়ারিশানদের স্বাক্ষর জাল করে ঢাকা জেলা প্রশাসক (আগ্নেয়াস্ত্র শাখা)’ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোতিায় নিজের নামে করে নেন। আর সেই আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে নিজের গর্ভধারিণী মা’কে গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন। এ ঘটনায় রাজধানীর বংশাল থানায় একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জালিয়াতির মাধ্যমে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স এর বিষয়টি উপ-পুলিশ কমিশনার লালবাগ এর নির্দেশে তদন্ত করা হয়েছে। উক্ত তদন্ত প্রতিবেদনে জালিয়াতির ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। আর সেই তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে জাকির হোসেন রনির ভয়াবহ ঋণ জালিয়াতি চাঞ্চল্যকর তথ্য। 

এছাড়া, গত ৪ জুন তার মা মোর্শেদা বেগম ওহাব ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে জালিয়াতির নামে নেওয়া অস্ত্রের লাইসেন্সটি বাতিলের জন্য আবেদন করেছেন। ওই অস্ত্রটি তাদের জীবন হুমকির মধ্যে ফেলেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। 

স্থানীয়রা জানায়, প্রতারক জাকির হোসেন রনি ২০১৫ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (দক্ষিণ) এর কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে প্রার্থী হন। পরে এই ব্যাংকের ঋণ খেলাপির দায়ে তার প্রার্থিতা বাতিল হয়। পরে প্রভাবশালীদের মদদে ব্যাংক ঋণ থাকার পরও ২০২০ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (দক্ষিণ) এর কাউন্সিল পদে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে। তখন তার জামানত বাতিল হয়েছিল। জাকির হোসেন রনি ব্যাংক ঋণ নিলেও তিনি সেই টাকা দিয়ে ব্যবসা না করে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ না করে আরো একটি বিল্ডিং এর কন্সট্রাকশনের কাজ করাচ্ছে। ব্যাংক কর্মকর্তা এ বিষয়টি জানার পরও কোনরূপ পদক্ষেপ নিচ্ছেন না বলে ভুক্তভোগিরা অভিযোগ করেছেন।
 


আরও পড়ুন