আশা এনজিওর ৫০ লাখ টাকা চুরি করে পালিয়েছে লোন অফিসার আল আমিন
প্রকাশিত: ১৫-৬-২০২৪ বিকাল ৫:৩৫
বেসরকারি আর্থিক সংস্থা "আশা"র পটুয়াখালীর দুমকি শাখার লোন অফিসার মো: আল আমিন সংস্থাটি থেকে নগদ প্রায় ৫০ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। আশা এনজিওর বরগুনা এবং পটুয়াখালী অঞ্চলের জেলা কর্মকর্তারা গত একসপ্তাহ আল আমিনের গ্রামের বাড়ি গিয়ে আত্মসাৎকৃত টাকা ফেরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিরা ইউনিয়নের দক্ষিণ পশ্চিম জালিয়াঘাটা গ্রামের বাড়িতে জেলা অফিসের কর্মকর্তারা বার বার যাওয়ার কারনে আল আমিনের টাকা চুরির বিষয়টি প্রতিবেশীদের কাছে পরিস্কারভাবে জানাজানি হয়। প্রতিবেশীরা জানতে পায় আশা এনজিওর ৫০ লাখ টাকা চুরি করে পালিয়েছে লোন অফিসার আল আমিন।
আশা'র লোন অফিসার আল আমিন জালিয়াঘাটা গ্রামের নানা বাড়িতে জন্ম নেয়। সেই নানা বাড়িতেই আল আমিন এবং বড় ভাই ফোরকান ও ছোট ভাই আবুল বাশার ছোট বোন মুক্তামনি নামের চার ভাই বোনের জন্ম হয় নানা আজিজ খানের বাড়িতে। নানা বাড়িতেই আল আমিনেরা বড় হয়। ওষুধ সংস্থায় কিছু দিন চাকুরী করার কারনে আল আমিনের বাবাকে এলাকার লোকজন করিম ডাক্তার নামে চিনতো। আল আমিনের বাবা মাঝে মাঝে দ্বিতীয় শশুড় বাড়ি এসে আল আমিনের মায়ের জন্য কিছু নগদ টাকা দিতে এবং চাল ডাল কিনে রেখে যেত। করিম ডাক্তার পাথরঘাটা উপজেলার নাচনাপারা ইউনিয়নের বাশতলা বাজারে প্রথম বিয়ে করে। সেই সংসারের ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসার শুরু করলেও আল আমিনের মা রাশিদার প্রেমে পরে গিয়ে ছেলে মেয়ে স্ত্রী রেখে আলা আমিনের মা রাশিদাকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে বাধ্য হয়। দক্ষিণ পশ্চিম জালিয়াঘাটা গ্রামে আল আমিনের নানা মৃত্যু আজিজ খান পাশের ইউনিয়ন রায়হানপুরের লেমুয়া থেকে এসে জালিয়াঘাটায় ৫০ বছর আগে যাযাবর জীবন জাপন শুরু করে। আল আমিনের নানার বাড়ি যেমন অস্থায়ী তেমনি আল আমিনের মা নিজেও বিয়ের পরে আর কখনোই স্বামীর বাড়ি যেতে না পেরে পিতার বাড়িতেই একটি আলাদা ঘর তৈরি করে বসবাস করছে। আল আমিনের কোন স্থায়ী বাবার বাড়ি নেই। নানা আজিজ খানের মৃত্যুর পরে সকলে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যাযাবর আজিজ খানের দুটি ছেলে শাজাহান ও ফারুক বিদেশে থাকে অন্য লোকের টাকা লোন নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছে। সেই লোনের টাকা পরবর্তীতে আংশিক পরিষদের কথা জানা যায়।
পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার রিজওয়ানাল ম্যানেজার রবিউল ইসলাম দৈনিক সকালের সময়ের সাথে টেলিফোনে অভিযোগ করে বলছেন লোন অফিসার মো: আল আমিনকে কিছুদিন আগে দুমকি শাখা থেকে কলাপাড়া শাখায় বদলি করা হয়েছিলো। আল আমিনকে দেখতে খুব শান্তশিষ্ট তবে সে খুব চালাক ও দুরন্ত স্বভাবের। ম্যানেজারের চোখ ফাঁকি দিয়ে ১৯ লাখ ৩৯ হাজার ৬ শতো ২৫ টাকার চুরি করে পালিয়েছে। এতে আমরা সকলেই বিস্মিত। প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়েছে এই টাকা তবে টাকার অংক ৫০ লাখ পর্যন্ত হবে বলে আমরা প্রাথমিক ভাবে ধারণা করছি। রিজওয়ানাল ম্যানেজার রবিউল ইসলাম বলছেন আল আমিন আত্মগোপনে যাবার পরে তার ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায়ের লেনদেনে অসংগতি লক্ষ করছি। আজ আল আমিনের মামা (যিনি সৌদি প্রবাসী) শাজাহানের স্ত্রীর সাথে কথা বলছি যেন তার মামা ভাগনে আল আমিনকে হঠাৎ বিদেশে নিতে সহায়তা না করে। আল আমিনকে লুকিয়ে থাকতে যারা সাহায্য করবে সকলকে আইনের আওতায় নিয়ে আশার কথা জানিয়ে তিনি বলেন আমরা পটুয়াখালী ও বরগুনার দুই জেলার কর্মকর্তারা দুই সপ্তাহ ধরে আল আমিনকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।
৬ জুন ২০২৩ তারিখ অফিস শেষে আল আমিন দুমকি থেকে গ্রামের নানা বাড়িতে চলে যায়। যেহেতু আল আমিনের বাবার কোন নিজস্ব বাড়িতে আল আমিনের বাবা গ্রহণ করেনি তাই নানা বাড়িকেই আল আমিন নিজেদের বাড়ি বলেই মনে করে। মায়ের যাযাবর জীবনে দারিদ্র্যের ছায়াতলে বেড়ে ওঠা আল আমিন জুনিয়র লোন অফিসার পদে বরিশাল অঞ্চলে চাকুরী নিয়েছিলো ৭-৮ বছর আগে। পরবর্তীকালে একই বিভাগের পটুয়াখালীর দুমকি বদলি হয়ে দ্বায়িত্ব পালন করতেছিল। অফিসে ছুটি না নিয়ে হঠাৎ করে সপ্তাহ খানেক আল আমিন অনুপস্থিত থাকায় রিজওয়ানাল ম্যানেজার রবিউল ইসলাম তার সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করে। আল আমিন রিজওনাল ম্যানেজারকে টেলিফোনে বলে মায়ের পরামর্শে তিনি আর অফিস করতে চান না। গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে লোন আদান প্রদান খুব কষ্টসাধ্য ধারণা করে আল আমিনের মা একসময় আশা এনজিওর লোন নিয়েছিলো তাই এই সংস্থার কাজের কষ্টের অভিজ্ঞতা তার আছে, তাই ছেলে আল আমিনকে নিষেধ করছে অফিস করতে। আল আমিনের বড় ভাই ফোরকান উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করে সেখানে আল আমিনের জন্য কম কষ্টের চাকরি ঠিক করছে রিজওয়ানাল ম্যানেজার রবিউল ইসলামকে আল আমিন জানিয়ে বলেন আশ এনজিওর চাকরিতে অনাগ্রহের কথা। আল আমিনের অফিসে যোগদান করা নিয়ে গড়িমসি দেখে কর্মকর্তারা তার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ শুরু করে। শুরুতেই তহবিল তসরুপের প্রমাণ পেয়ে যায় জেলা অফিস। সাথে সাথেই জেলার কর্মকর্তারা হেড অফিসকে অবহিত করে। তার পরেই হেড অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী আল আমিনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে তদন্ত কমিটি করে। প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়েছে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা তসরুপ করার বিষয়টি। এখন তারা আল আমিনের ব্যাপার মামলা করার দিকে এগুচ্ছে। হেড অফিসের নির্দেশনা পেলেই পরবর্তী ব্যাবস্থা নেয়ার কথা জানিয়ে রিজওয়ানাল ম্যানেজার রবিউল ইসলাম। এই প্রতিবেদন লেখার সময় ১৫ জুন বিকেল পর্যন্ত আল আমিনের মামা বাড়িতে বরগুনা ও পটুয়াখালী দুই জেলার প্রায় ২০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলো। তার এসেছিলো আল আমিনকে খুঁজতে। স্থানীয় শতাধিক লোকের উপস্থিতিতে আল আমিনকে উদ্ধার করে আশা এনজিওর টাকা ফেরত দেয়ার দ্বায়িত্ব নেয় স্থানীয় ইউপি সদস্য ফারুখ হোসেন সেন্টু। সেন্টু মেম্বারের এমন দ্বায়িতশীল অঙ্গীকার পেয়ে আশা'র কর্মকর্তারা ফিরে যায়।
জেলার কর্মকর্তার এবং আল আমিনের নানা বাড়ির লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে আল আমিনের প্রতিবেশী মামা নুরুজ্জামান এবং ফারুখ হোসেন সেন্টু এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী সুদি কাদেরের ছেলে জহির আলীম তাপস আল আমিনকে প্রতিপোষণ দিয়ে সবধরনের সহযোগিতা করছে। আল আমিনের সহযোগী ফারুখ হোসেন সেন্টু স্থানীয় ইউপি সদস্য হলেও তিনি ১০ বছর ইউনিয়নে অনুপস্থিত। সেন্টু মেম্বারের নামে একাধিক মামলা থাকায় কিছু দিন আগে তিনি জেল খেটে আসছে। অন্যের জমি দখল এবং গ্রামের সহজসরল মানুষকে ব্যাংক লোন পাইয়ে দেয়ার কথা বলে তাদের জমির দলিল নিয়ে ব্যাংক থেকে যে টাকা উত্তলন করে তার ৮০ শতাংশ আত্মসাৎ করে এই ইউপি সদস্য ফারুক হোসেন সেন্টু।

